চাঁদপুরের স্বর্ণ ব্যবসায়ী পিন্টু দাস ও তার পরিবারের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশ ও দেশের বাইরে ছড়ানো চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর 'হিন্দু নিধন'-এর বানোয়াট গুজবের অবসান ঘটেছে। দীর্ঘ প্রায় এক সপ্তাহ আত্মগোপনে থাকার পর আজ চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার দলঘাট দাসপাড়া থেকে পুলিশ পিন্টু দাস ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে। বিপুল পরিমাণ ব্যবসায়িক ঋণ ও গ্রাহকদের স্বর্ণালংকার বুঝিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েই মূলত তারা মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপনে গিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই উদ্ধারের মধ্য দিয়ে একটি বিশেষ মহলের বাংলাদেশ বিরোধী গভীর ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পিত অপপ্রচারের নগ্ন রূপ জনসম্মুখে উন্মোচিত হয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে পিন্টু দাসের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে পুঁজি করে ভারত ও বাংলাদেশের কিছু হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে ব্যাপক অপপ্রচার শুরু করে। রংপুরে গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের (যার মূল অপরাধীরা ছিল একই ধর্মাবলম্বী) সাথে চাঁদপুরের এই ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যুক্ত করে তারা দাবি করতে থাকে যে, বাংলাদেশে পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে হত্যা ও গুম করা হচ্ছে। এই ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে ভারতের কিছু উগ্রপন্থী নেতা বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তাদের সরকারের কাছে আবেদন জানান। এমনকি গুজব ছড়িয়ে আগামী সপ্তাহে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ ডেপুটি হাই কমিশন ঘেরাওয়েরও ডাক দেওয়া হয়।
দেশের অভ্যন্তরেও কয়েকজন সংখ্যালঘু নেতা এই অপপ্রচারে সুর মিলিয়ে দাবি করেন যে, পিন্টু দাসের পরিবারকে হত্যার পর লাশ গুম করা হয়েছে এবং এর ফলে সমগ্র হিন্দু সম্প্রদায় চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছে। তারা পরিকল্পিতভাবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করছিলেন যেন মনে হয় দেশে সংখ্যালঘুদের বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় আজ প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে। অনুসন্ধানে জানা যায়, পিন্টু দাস দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের স্বর্ণালংকার ফেরত দিচ্ছিলেন না এবং বাজারে তার দেনার পরিমাণ বিপুল আকার ধারণ করেছিল। পাওনাদারদের চাপ থেকে বাঁচতে এবং সম্ভবত সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যেই তিনি সপরিবারে আত্মগোপন করেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পিন্টু দাসের আত্মগোপনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্তের দুই পারের উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর এই সমবেত প্রতিক্রিয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি মূলত বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে দেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অস্থিতিশীল প্রমাণ করার একটি সুপরিকল্পিত যোগসাজশ। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী যখন তাদের ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে পারস্পরিক সহাবস্থানে বিশ্বাসী, তখন এ ধরনের কাল্পনিক 'হিন্দু নিধন'-এর গল্প ফেঁদে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার অপচেষ্টা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করেন, দেশবিরোধী এই ধরনের চক্রান্ত ও চটকদার গুজবের বিরুদ্ধে দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে অত্যন্ত সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে। সত্যনিষ্ঠ তথ্যের ভিত্তিতে যেকোনো অপপ্রচার রুখে দিয়ে জাতীয় ঐক্য, শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
