ঢাকা: সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি এবং প্রতিবেশী দেশের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের পেক্ষাপটে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে বাংলাদেশে সংঘটিত নজিরবিহীন গণহত্যা এবং স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার নৃশংসতার চিত্র আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ভারতে সাম্প্রতিক আন্দোলন দমনে পানি ছিটানো বা জলকামান ব্যবহারের কৌশল দেখা গেলেও, বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে তৎকালিন স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার বলপ্রয়োগের মাত্রা ছিল মানবতা ও ইতিহাসের সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদিকুর রহমান খানের পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে জানা যায়, ভারতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দমনে জলকামান ব্যবহার করা হলেও বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের রাজপথে মুখোমুখি হতে হয়েছিল বুলেট ও বারুদের। যেখানে ভারতের মতো দেশে এ ধরনের আন্দোলনে কোনো শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাকে গুম করা বা গণহারে গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনা দেখা যায়নি, সেখানে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নির্দেশে একদিনেই দেশের তিন বিভাগে গুলি চালিয়ে সাতটি তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
জুলাই অভ্যুত্থানের সেই ভয়াবহ দিনের বর্ণনায় উঠে আসে, তৎকালীন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও আওয়ামী ক্যাডাররা রাজধানী ঢাকায় আন্দোলনরত ভাইদের নির্মমভাবে হত্যা করে ট্যাংক থেকে নিচে ফেলে দিয়েছিল। এমনকি নিজেদের ঘরবাড়ির ছাদ বা বারান্দায় খেলাধুলা কিংবা দাঁড়িয়ে থাকা ছয় বছরের নিষ্পাপ শিশুদের লক্ষ্য করেও হেলিকপ্টার থেকে নির্দয়ভাবে গুলি চালানো হয়, যা যেকোনো সভ্য সমাজে অকল্পনীয়।
ইতিহাসের নির্মমতার তুলনা টেনে বিশ্লেষকরা জানান, মাত্র ২০ দিনের ব্যবধানে আনুমানিক দুই হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা করার ঘটনা পৃথিবীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের ইতিহাসে চরম বিরল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসক ইয়াহিয়া খান যে পরিমাণ হিংস্রতা ও ঘৃণা নিয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, শেখ হাসিনা এ দেশের শাসক হয়েও সমপরিমাণ ঘৃণা ও আক্রোশ নিয়ে নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর তাণ্ডব চালিয়েছিল। প্রতিবেশী দেশ নেপালের রাজনৈতিক আন্দোলনে মৃতের সংখ্যা ছিল মাত্র দুজন এবং শ্রীলঙ্কার গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১২ জন। সে তুলনায় বাংলাদেশে সংঘটিত রক্তপাত প্রমাণ করে, স্বৈরাচারী শাসনের কাছে বাঙালির রক্তের মূল্য কতটা সস্তা করা হয়েছিল।
ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শাসনামল নানা কারণে সমালোচিত হলেও, নিজ দেশের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখোমুখি হয়ে নৃশংসতার দিক থেকে তিনি বাংলাদেশের বিগত স্বৈরাচারী শাসনের ক্ষুদ্রতম অংশের সমতুলেও পৌঁছাতে পারেননি। ভারতে আন্দোলনকারীদের ওপর পানি ছিটানো হলেও বাংলাদেশে গোসল করানো হয়েছিল তাজা রক্ত দিয়ে।
এই অভূতপূর্ব আত্মত্যাগ এবং নজিরবিহীন গণহত্যার স্মৃতি স্মরণ করে সচেতন মহল মনে করেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অর্জিত ‘৩৬ জুলাই’ দেশের মানুষের জন্য এক অমূল্য ও অনন্য অর্জন। অগণিত শহীদের সাগরের মতো রক্ত আর অসীম ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া এই নতুন স্বাধীনতা ও বিজয়ের চেতনাকে ধারণ করে দেশের সামাজিক মূল্যবোধ, দ্বীনি ইনসাফ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা এখন সময়ের প্রধান দাবি।

