ঢাকা: প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কট্টর সমালোচক ও ইসলামের ঘোর বিরোধী আবু লাহাবকে হাউজে কাউসারের পানি পান করানো হবে মর্মে সমাজে একটি দাবি প্রচলিত থাকলেও, ইসলামী শরিয়ত ও বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য প্রমাণ অনুযায়ী, হাউজে কাউসারের পবিত্র পানি আখেরাতে কেবল মুমিনদের জন্য নির্ধারিত। মূলত সহিহ বুখারিতে বর্ণিত একটি ভিন্ন ঘটনাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যার মাধ্যমে জনমনে এই মারাত্মক বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।
প্রেক্ষাপট ও হাদিসের প্রকৃত ঘটনা
বিশুদ্ধ ইসলামী ইতিহাস ও হাদিস গ্রন্থগুলোর পর্যালোচনায় দেখা যায়, আবু লাহাবের হাউজে কাউসার থেকে পানি পানের কোনো সুযোগ বা প্রমাণ নেই। পবিত্র কুরআনের 'সূরা লাহাব'-এ তার চূড়ান্ত পরিণতি জাহান্নাম বলে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে সমাজে যে ঘটনার ওপর ভিত্তি করে এই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে, তার প্রকৃত বিবরণ রয়েছে 'সহিহ বুখারি' (হাদিস নম্বর ৫১০১)-তে। উরওয়া ইবনে জুবায়ের (রা.) থেকে বর্ণিত বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, আবু লাহাবের মৃত্যুর পর তার পরিবারের একজন সদস্য (হজরত আব্বাস রা.) তাকে স্বপ্নে অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় দেখেন। স্বপ্নে আবু লাহাব জানান, মৃত্যুর পর তিনি কোনো শান্তি পাননি। তবে প্রতি সোমবার তার শাস্তি কিছুটা লাঘব করা হয় এবং আঙুলের ইশারায় তাকে সামান্য পানি পান করতে দেওয়া হয়।
এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবীজি (সা.)-এর জন্মের দিন দাসী সুয়াইবা যখন আবু লাহাবকে ভাতিজা জন্মের সুসংবাদ দিয়েছিলেন, তখন আনন্দে তিনি ওই দাসীকে মুক্ত করে দিয়েছিলেন। নবীজির জন্মের আনন্দে দাসী মুক্ত করার কারণে আল্লাহ তায়ালা তাকে এই সামান্য প্রতিদান দেন।
হাউজে কাউসারের সাথে এর মৌলিক পার্থক্য
- পানির উৎস ও পরিমাণ: আবু লাহাবকে প্রতি সোমবার যে সামান্য পানি দেওয়া হয়, তা জাহান্নামের শাস্তির মাঝে তার আঙুল থেকে নিঃসৃত অত্যন্ত নগণ্য পরিমাণ পানি। এটি কোনোভাবেই আখেরাতের মহাসম্মানিত 'হাউজে কাউসার' নয়।
- হাউজে কাউসারের প্রকৃত অধিকারী: হাউজে কাউসার হলো হাশরের ময়দানের একটি বিশেষ হাউজ, যার পানি নবীজি (সা.) কেবল তার উম্মতের মুমিন ও অনুগত বান্দাদের পান করাবেন। কুরআন ও সুন্নাহ অস্বীকারকারী কাফের বা ইসলামের শত্রুদের সেখানে প্রবেশের কোনো অধিকার নেই।
- চূড়ান্ত পরিণতি: ইসলামী আকিদা অনুযায়ী, আবু লাহাব চিরস্থায়ী জাহান্নামি। তার এই সামান্য শাস্তি লাঘবের ঘটনাটি কেবল নবীজির (সা.) সম্মানের একটি নিদর্শন, আবু লাহাবের নাজাতের কোনো সনদ নয়।
ইসলামী ধর্মতত্ত্ব, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের জায়গা থেকে যেকোনো ধর্মীয় তথ্য, বিশেষ করে হাদিস বর্ণনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। যাচাই-বাছাই ছাড়া খণ্ডিত বা ভুল তথ্য প্রচার করা থেকে বিরত থাকা প্রতিটি সচেতন মুসলমানের দায়িত্ব।
