ঢাকা: জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম কেবল একটি উপাসনালয় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক মুসলিম উম্মাহর আধ্যাত্মিক কেন্দ্রবিন্দু ও চেতনার প্রতীক। এই মসজিদের মিম্বর থেকে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ দেশের আপামর জনসাধারণের ধর্মীয় দিকনির্দেশনা হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই মিম্বরের ভূমিকা এবং খতিবের অবস্থান নিয়ে জনমনে যে গভীর ক্ষোভ ও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, তা দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। ইসলামি শরিয়াহর দৃষ্টিতে একজন আলেম এবং খতিবের দায়িত্ব কেবল নামাজ পড়ানো নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হওয়া।
![]() |
| খতিব মাওলানা আব্দুল মালেক |
ইসলামের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, হক্কানি আলেমরা সবসময় জালিম শাসকের মুখের ওপর সত্য কথা বলতে দ্বিধা করেননি। পবিত্র কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, ন্যায়ের পথে অবিচল থাকা এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করা ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় জাতীয় মসজিদের মিম্বর থেকে যে নীরবতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা সচেতন মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
জনসাধারণের অভিযোগ, জাতীয় মসজিদের মতো স্পর্শকাতর পদে আসীন ব্যক্তি যখন শরিয়াহবিরোধী বক্তব্য, ইসলাম অবমাননাকর মন্তব্য, সামাজিক অপরাধ—যেমন ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি এবং দখলবাজির মতো জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নীরব থাকেন, তখন তা মিম্বরের মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষ করে, যখন শরিয়াহ আইনকে অবমাননা করা হয়, কোরবানির মতো অকাট্য বিধানকে কটাক্ষ করা হয়, কিংবা মাদক ও মৌলবাদকে সমান্তরালে উপস্থাপন করে ধর্মের ইমেজ ক্ষুণ্ণ করা হয়, তখন সেখান থেকে সাহসী প্রতিবাদ প্রত্যাশিত ছিল।
একটি মসজিদের খতিবের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত তিনি ইসলামের প্রতিনিধি, কোনো রাজনৈতিক শক্তির নয়। যদি খতিবের বক্তব্য বা নীরবতা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সহায়ক হয়, তবে তা সাধারণ মুসলমানদের আবেগে আঘাত করে। ইসলামি স্কলাররা মনে করেন, মিম্বর হলো ইনসাফ কায়েমের জায়গা। সেখানে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর তোষণ নীতি পরিহার করে যদি খতিবগণ জনগণের মৌলিক সমস্যা, ন্যায়বিচার এবং শরিয়াহর সুরক্ষায় আপসহীন ভূমিকা পালন করেন, তবেই দেশের অন্যান্য মসজিদের মিম্বরগুলো উজ্জীবিত হবে।
বর্তমানে দেশের আলেম সমাজের একটি বড় অংশের দাবি, মিম্বর থেকে কেবল আনুষ্ঠানিক খুতবা নয়, বরং সামাজিকভাবে ঘটে যাওয়া অনাচার এবং ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ও যৌক্তিক অবস্থান প্রয়োজন। মাদ্রাসায় বলাৎকার, শিক্ষাঙ্গনে নারী নির্যাতন কিংবা জননিরাপত্তার সংকট—এসব বিষয়ে জাতীয় মসজিদের নীরবতা প্রমাণ করে যে, প্রতিষ্ঠানের পদের চেয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা বা রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট থাকাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না।
পরিশেষে, বায়তুল মোকাররমের মিম্বর থেকে যদি হক কথা উচ্চারিত না হয়, তবে তা সমগ্র দেশের ধর্মীয় নেতৃত্বকে দুর্বল করে দেয়। ইসলামি ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে জাতীয় মসজিদের খতিবকে অবশ্যই দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে, শরিয়াহর অনুশাসন এবং ন্যায়ের পক্ষে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। জনমানুষের বিশ্বাস ও মর্যাদার এই পবিত্র স্থানটির পবিত্রতা রক্ষা করা এবং প্রকৃত হক্কানি আলেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সময়ের দাবি, যাতে করে মিম্বরের মর্যাদা এবং ঈমান কোনো পার্থিব স্বার্থের কাছে পরাজিত না হয়।
