ঢাকা: বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর কার্যক্রম এবং তৎকালীন নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে জনমনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও প্রশ্নের উদ্রেক রয়েছে। বিশেষ করে, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী অস্থির সময়ে এই বিশেষ বাহিনীর কর্মকাণ্ড এবং এর প্রধান হিসেবে তোফায়েল আহমেদের ভূমিকা নিয়ে বিশিষ্ট লেখক ও চিন্তাবিদদের লেখনীতে কঠোর সমালোচনা উঠে এসেছে।
![]() |
| ফাইল ফটো |
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই তৎকালীন সরকারের অধীনে গঠিত এই আধাসামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। বিভিন্ন গবেষণা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দাবি করা হয় যে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর বিকল্প হিসেবে এবং ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাববলয় সুসংহত করার লক্ষ্যে এই বাহিনী গঠন করা হয়েছিল। হায়দার আকবর খান রনো, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, আল মাহমুদ ও বদরুদ্দীন উমরসহ বিভিন্ন প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব তাঁদের রচনায় রক্ষীবাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত অনাচার ও রাজনৈতিক নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরেছেন।
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ভারতের পক্ষ থেকে তৎকালীন সময়ে অবিশ্বাস করার কারণে একটি শক্তিশালী ও অনুগত প্যারামিলিটারি ফোর্স গড়ে তোলাই ছিল এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য। রক্ষীবাহিনীর প্রশিক্ষণ, ডকট্রিন এবং কমান্ড ও কন্ট্রোল প্রক্রিয়ায় বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার পরোক্ষ হস্তক্ষেপের বিষয়টি তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি বড় বিতর্ক হিসেবে বিবেচিত হয়। তোফায়েল আহমেদ যেহেতু এই বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন, তাই এই বাহিনীর বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায়ভার ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তৃণমূল পর্যায় থেকে পাওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন গ্রামে রক্ষীবাহিনীর অভিযানের নামে তল্লাশি, হয়রানি এবং বলপ্রয়োগের মতো অমানবিক কর্মকাণ্ডের নজির পাওয়া যায়। অথচ, যে নেতৃত্বের সুরক্ষার জন্য এই বাহিনী গঠিত হয়েছিল, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই নেতৃত্বের বিয়োগান্তক ঘটনার সময় তোফায়েল আহমেদের অবস্থান ও পরবর্তী ভূমিকা নিয়ে জনমনে এক গভীর সংশয় রয়ে গেছে।
বর্তমানে মূলধারার গণমাধ্যমে তোফায়েল আহমেদকে 'বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ' হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, দেশের একটি বড় অংশ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের এই বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকে উপেক্ষা করাকে জাতীয় ইতিহাসের প্রতি অবহেলা বলে মনে করেন। দেশের স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে যারা ইতিহাস বিশ্লেষণ করেন, তারা মনে করেন যে, রক্ষীবাহিনীর অন্ধকার অধ্যায়টি নতুন প্রজন্মের সামনে সঠিকভাবে উন্মোচিত হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে ইতিহাসের এই কঠোর বাস্তবতাকে মুছে ফেলার সুযোগ নেই।
