ঢাকা: জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমের খতিবের মিম্বর সবসময়ই দেশের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতির এক গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
![]() |
| ফাইল ফটো |
সম্প্রতি বর্তমান খতিব মুফতি আব্দুল মালেকের বিভিন্ন বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে জনমনে এক গভীর বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠতা এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ যেন অতীতের খতিবদের মতোই বর্তমান মিম্বরেও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিতর্ক কেবল একজন ব্যক্তির নয়, বরং জাতীয় মসজিদের পবিত্রতা ও তার প্রভাব নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার এক প্রতিফলন।
বাইতুল মোকাররমের সাবেক খতিব মুফতি মোহাম্মদ রুহুল আমিনের সময়কালে মিম্বরকে ক্ষমতাসীনদের স্বার্থে ব্যবহারের যে অভিযোগ উঠেছিল, তা আজও মানুষের স্মৃতিতে অম্লান। তিনি এক সময় নির্দিষ্ট মহলের অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন। তবে রাজনীতির পালাবদলে বর্তমান খতিব মুফতি আব্দুল মালেকের নাম সামনে আসার পর থেকেই পরিস্থিতির তেমন কোনো বড় পরিবর্তন দেখছেন না সচেতন মহল। অনেকের অভিযোগ, আলেমদের একটি অংশ ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়কে কেন্দ্র করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন, যা শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারকে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পরোক্ষ সহায়তা করে।
বর্তমান খতিবকে ঘিরে বিতর্কের শুরু হয়েছে তার সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য ও আচরণকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ রয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোটবদ্ধ থাকার কারণে তিনি আল্লামা মামুনুল হক সাহেবের প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করেননি। এছাড়া জুমার খুতবায় তার গণভোটবিরোধী অবস্থান এবং “নামের পাশে ইসলাম থাকলেই ভোট দেওয়া যাবে না”—এ ধরনের মন্তব্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। এই বক্তব্যটি কাদের উদ্দেশ্য করে দেওয়া হয়েছিল, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। সমালোচকদের মতে, যদি “ইসলাম” নাম থাকলেই ভোট দেওয়া না যায়, তবে “জাতীয়তাবাদ” বা অন্যান্য রাজনৈতিক ধারার ক্ষেত্রে একই মানদণ্ড প্রয়োগ না করা কতটা যুক্তিসঙ্গত? তারা প্রশ্ন তুলছেন, আজকের রাজনীতির যে সংকটময় বাস্তবতা, তা কি সেই জাতীয়তাবাদী রাজনীতিরই ফল নয়? অনেক ধর্মপ্রাণ মানুষ খতিবের এই অবস্থানে বিএনপি বা জনাব তারেক রহমানের প্রতি এক ধরনের রাজনৈতিক দুর্বলতা দেখছেন কি না, তা নিয়েও জনপরিসরে আলোচনা চলছে।
একজন আলেমের গ্রহণযোগ্যতা তার জ্ঞান ও নিরপেক্ষতার ওপর নির্ভর করে। মুফতি আব্দুল মালেককে অনেকেই “দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ আলেম” হিসেবে অভিহিত করেন। কিন্তু একজন আলেমের অন্তরে যদি রাজনৈতিক বিদ্বেষ বা পক্ষপাতিত্বের ছায়া পড়ে, তবে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষ তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। ইসলাম ন্যায় ও ইনসাফের ধর্ম; সেখানে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাত বা অন্যায্য বিদ্বেষের স্থান নেই।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পক্ষ থেকে দাবি তোলা হচ্ছে যে, “এত বড় আলেমের সমালোচনা করা যাবে না।” এই ধারণার বিপরীতে প্রাজ্ঞজনেরা মনে করছেন, এটি একটি ভুল বার্তা। ইসলামে কেউ-ই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন; সাহাবায়ে কেরাম বা নবী-রাসূলদের ব্যতিরেকে কেউই ভুলের ঊর্ধ্বে নন। আলেমদের সমালোচনা করার অর্থ তাদের অপমান করা নয়, বরং তাদের কাজের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা।
মিম্বরের প্রকৃত মর্যাদা তখনই সমুন্নত হয়, যখন তা সত্য কথা বলার সাহস যোগায়। মসজিদ কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা প্রচারের স্থান নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে হক কথা বলার পাদপীঠ। আলেমদের জ্ঞান কেবল তখনই মূল্যবান ও কার্যকর হয়, যখন তা সমাজ ও রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সাহস জোগায়। বাইতুল মোকাররমের মিম্বর থেকে জনগণ এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে, যা কোনো দলীয় বৃত্তে বন্দি না হয়ে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সত্যের পথে অবিচল থাকবে।
