ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালায় সম্প্রতি দেশের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের ওপর জুতা নিক্ষেপের একটি ছবি প্রদর্শনের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ওপর জুতা হামলার ঘটনা। ১৯৭৮ সালের ২৬ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতেই তৎকালীন সামরিক শাসক ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভ ও জুতা হামলার শিকার হয়েছিলেন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও মিথ্যা বয়ানের ওপর ভিত্তি করে একটি পরিমিতপন্থী ইসলামী দলের নেতার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হলেও, খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে দেশের আরেকজন শীর্ষ নেতার এমন বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হওয়ার ঐতিহাসিক সত্যটি অনেকেই এড়িয়ে যান।
সাম্প্রতিক বিতর্কের সূত্রপাত:
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু সংগ্রহশালায় বিভিন্ন ঐতিহাসিক ছবি স্থাপনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। এর অংশ হিসেবে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের কিছু কর্মী অধ্যাপক গোলাম আযমের ওপর জুতা নিক্ষেপের একটি ছবি সেখানে টানিয়ে দেয়। মূলত একটি পরিমিতপন্থী ও আদর্শিক ইসলামী দলের নেতাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে 'যুদ্ধাপরাধী' আখ্যা দিয়ে যে মিথ্যা বয়ান তৈরি করা হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় এই একপেশে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, অধ্যাপক গোলাম আযমের ওপর হামলার ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৮১ সালে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে। কিন্তু এই ঘটনার জের ধরেই সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটিতে ঘটে যাওয়া ১৯৭৮ সালের সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটি নিয়ে, যেখানে খোদ জিয়াউর রহমানকেই জুতা হামলার শিকার হতে হয়েছিল।
১৯৭৮ সালের ২৬ অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহ:
ইতিহাসের পাতা ও তৎকালীন রাজনৈতিক দলিল থেকে জানা যায়, ১৯৭৮ সালের ২৬ অক্টোবর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পরিদর্শনে যান। সে সময় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তপ্ত। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছিল।
জিয়াউর রহমান যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন, তখন সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিরোধী মতাদর্শের ছাত্ররা তাকে লক্ষ্য করে তীব্র বিক্ষোভ শুরু করে। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা তাকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ করে। তৎকালীন অনেক প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান ও ঐতিহাসিক তথ্যমতে, শিক্ষার্থীদের নিক্ষিপ্ত জুতার বারি সরাসরি তার গায়ে আঘাত হানে। ওইদিন চরম অবমাননাকর ও বিব্রতকর অবস্থায় ক্যাম্পাস থেকে ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি।
প্রেক্ষাপট ও পরবর্তী প্রভাব:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জুতা হামলার ঘটনাটি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের এমন ক্ষোভ ও প্রতিরোধের মুখে পড়ে তিনি অনুধাবন করতে পারেন যে, রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকতে হলে এবং শিক্ষাঙ্গনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হলে নিজস্ব একটি ছাত্র সংগঠন থাকা অপরিহার্য।
এই ঘটনার পরই জিয়াউর রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নিজস্ব ছাত্র সংগঠন প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে ওঠেন। রাষ্ট্রযন্ত্রের আনুকূল্য, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক প্রলোভন, এমনকি শিক্ষার্থীদের প্রমোদভ্রমণে বিদেশে পাঠানোর মতো পদক্ষেপ নিয়ে তিনি ক্যাম্পাসে অনুগত একটি গোষ্ঠী তৈরির উদ্যোগ নেন। যার ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে ছাত্র রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ শুরু হয় এবং তার পৃষ্ঠপোষকতায় ক্যাম্পাসে অনুগত ছাত্র সংগঠনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়।
ঐতিহাসিক পর্যালোচনা:
ইতিহাস সবসময় তার নিজস্ব গতিতে চলে। মতাদর্শিক ভিন্নতা বা রাজনৈতিক বিরোধের কারণে দেশের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী মূল্যবোধ ধারণকারী নেতাদের কালিমালিপ্ত করার যে অপচেষ্টা বিভিন্ন সময় দেখা যায়, তা মূলত একপেশে ইতিহাস চর্চারই অংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিয়াউর রহমানের ওপর জুতা হামলার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃত ইতিহাস কখনোই মুছে ফেলা যায় না। রাজনৈতিক হীনম্মন্যতা ও বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চাই পারে জাতিকে সঠিক পথের দিশা দিতে।
