ঢাকা: ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাস। ব্রিটিশ ভারতের বিভাজন এবং পাকিস্তানের স্বাধীনতার রক্তক্ষয়ী অধ্যায় রচিত হয়েছিল সীমাহীন মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে। ভারত থেকে নিজ ভূখণ্ডে হিজরত করা লাখো মুসলিম শরণার্থীর ওপর নেমে এসেছিল ইতিহাসের অন্যতম বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ। বিশেষ করে ‘দ্য ঘোস্ট ট্রেন’ বা লাশের ট্রেনের মর্মান্তিক ঘটনাগুলো আজও উপমহাদেশীয় মুসলিমদের রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য স্মরণ করিয়ে দেয়। উপমহাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে অর্জিত এই স্বাধীনতা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, দেশভাগের সময় ভারত থেকে লাহোর বা অমৃতসরে পৌঁছানো অনেক ট্রেনে কোনো জীবিত মানুষের অস্তিত্ব থাকত না; বগিগুলো পরিণত হতো লাশের স্তূপে। সীমান্ত পারাপারের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত এই ট্রেনগুলোতে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো নির্মম হামলা চালিয়ে মুসলিম যাত্রীদের হত্যা করত। চরম অবমাননাকর বিষয় ছিল, লাশে পরিপূর্ণ ট্রেনের গায়ে রক্ত বা কয়লা দিয়ে উসকানিমূলক বার্তা লিখে দেওয়া হতো—‘এ গিফট টু জিন্নাহ’ বা জিন্নাহর জন্য উপহার।
সে সময় শত শত কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে ভারতীয় মুসলিমরা পাকিস্তানে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু যাত্রাপথে উগ্র হিন্দু ও শিখদের সংঘবদ্ধ হামলায় প্রাণ হারান হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষ। নারীদের সম্মানহানি ও নির্যাতনের অসংখ্য নির্মম ঘটনা ঘটে। সম্ভ্রম রক্ষার্থে বহু মুসলিম নারী রাস্তার পাশের কূপের পানিতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মবিসর্জন দেন। এমনকি তৃষ্ণার্ত মুসলিমদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে যাত্রাপথের কূপগুলোতে বিষ মিশিয়ে রাখার মতো অমানবিক কৌশলও অবলম্বন করা হয়েছিল।
ঐতিহাসিকদের মতে, দেশভাগের এই নির্মম ইতিহাস অনেক ক্ষেত্রেই নতুন প্রজন্মের কাছ থেকে আড়াল করে রাখা হয়েছে। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানা মহলে সমালোচনার অবকাশ থাকলেও, উপমহাদেশের মুসলিমদের জন্য একটি স্বাধীন ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য। আজ মুসলিমরা স্বাধীনভাবে নিজেদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে পারছেন, মসজিদে আজান দিতে পারছেন এবং নির্বিঘ্নে ধর্মীয় উৎসব ও গরুর গোশত খাওয়ার অধিকার ভোগ করছেন—তার পেছনে ১৯৪৭ সালের এই রাজনৈতিক মুক্তির সরাসরি প্রভাব রয়েছে।
বর্তমান ভারতের কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক চিত্র জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্বের যৌক্তিকতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতিবেশী দেশটিতে গরুর মাংস বহনের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা, মসজিদে নামাজরত অবস্থায় হামলা কিংবা জোরপূর্বক বিশেষ ধর্মীয় স্লোগান দিতে বাধ্য করার মতো ঘটনাগুলো প্রায়শই সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, ১৯৪৭ সালে মুসলিমদের জন্য একটি পৃথক ও স্বাধীন আবাসভূমির দাবি কতটা সময়োপযোগী ও দূরদর্শী ছিল।
১৯৪৭ সাল উপমহাদেশের মুসলিমদের অস্তিত্ব ও আত্মমর্যাদার এক অঘোষিত ভিত্তি। আগামীর প্রজন্মের কাছে এই প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা এখন একটি সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কট্টরপন্থীদের আগ্রাসন থেকে মুসলিম উম্মাহকে রক্ষা করার জন্য উপমহাদেশের রাজনৈতিক মুক্তির অবিসংবাদিত নেতা, কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঐতিহাসিক অবদানকে আজও গভীরভাবে স্মরণ করা হয়।
