জাতীয় সংসদে ইসলামী ব্যাংকের পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প (আরডিএস) নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের সাথে ব্যাংকটির অফিসিয়াল বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যের চরম অসঙ্গতি ও বৈসাদৃশ্য পাওয়া গেছে। সম্প্রতি সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, আরডিএস প্রকল্পের মাধ্যমে ২২ হাজার কোটি টাকা বণ্টন করা হয়েছে, যার মধ্যে গত ৫ আগস্টের পর ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। তবে ইসলামী ব্যাংকের সর্বশেষ নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত ৩০ বছরে এই প্রকল্পে মোট বিতরণের পরিমাণ মন্ত্রীর দাবির চেয়ে বহুগুণ কম এবং ঋণ আদায়ের হার প্রায় শতভাগ। দেশের অন্যতম শীর্ষ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের একটি সফল প্রকল্প নিয়ে দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপনে সচেতন মহলে তীব্র বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।
![]() |
| ফাইল ফটো |
ইসলামী ব্যাংকের বার্ষিক প্রতিবেদন (পৃষ্ঠা-৫৯) অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া আরডিএস কর্মসূচির আওতায় গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ৩৪ হাজার ৯০০টি গ্রামের ১৭ লক্ষ ৪৬ হাজার পরিবারকে সর্বমোট ৬ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে খেলাপির পরিমাণ মাত্র ২৩ কোটি ২৮ লাখ টাকা, যা অত্যন্ত নগণ্য। সামগ্রিকভাবে এই প্রকল্পের ঋণ আদায়ের হার ৯৭.৫ শতাংশ, যা দেশের ক্ষুদ্রঅর্থায়ন ও ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি অনন্য নৈতিক ও নিয়মতান্ত্রিক রেকর্ড হিসেবে বিবেচিত।
প্রতিবেদনের সুনির্দিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত আরডিএস প্রকল্পে বিনিয়োগের স্থিতি ছিল ৫ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, ২০২৪ সালের পুরো ১২ মাসে এই প্রকল্পে মোট ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৬৮৭ কোটি টাকা। আর পরবর্তী এক বছরে ঋণ বিতরণের পরিমাণ ছিল ৮০০ কোটি টাকা। বিগত দুই বছরে যেখানে সম্মিলিত ঋণ বিতরণের পরিমাণ ১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা, সেখানে কেবল ৫ আগস্টের পরবর্তী কয়েক মাসে কীভাবে ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণ সম্ভব—তা নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র বিস্ময় ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে ও পরে নারীদের ১০ হাজার টাকা করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে এবং নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দেওয়ার বিনিময়ে ধর্মীয় সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখানো হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট ক্রেডিট রেকর্ড ও পরিসংখ্যান মন্ত্রীর এই রাজনৈতিক দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমাণ করে।
অর্থনীতি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যদি ভোটারদের এই অর্থ অনুদান বা রাজনৈতিক উপঢৌকন হিসেবে 'বিনামূল্যে' বিলিয়ে দেওয়া হতো, তবে আরডিএস প্রকল্পের ঋণ আদায়ের হার ৯৭.৫ থেকে ৯৮ শতাংশ হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহভিত্তিক কঠোর ও নৈতিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণেই এই উচ্চ আদায় হার বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। একটি প্রতিষ্ঠিত ও সফল গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পকে ঘিরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অবাস্তব তথ্য পরিবেশন দেশের ব্যাংকিং খাতের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার শামিল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
