ঢাকা — শিলিগুড়ি করিডোর প্রশস্ত করার অজুহাতে বাংলাদেশের উত্তরপ্রান্তের সার্বভৌম ভূখণ্ড রংপুর বিভাগ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে দখল করার এক চরম আগ্রাসী ভূ-রাজনৈতিক প্রস্তাব ভারতের উগ্রপন্থী প্রতিরক্ষা মহলে উন্মোচিত হওয়ার পর দেশজুড়ে তীব্র উদ্বেগ ও ব্যাপক নিন্দা প্রকাশ পেয়েছে। ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রচারিত এই শত্রুতামূলক তাত্ত্বিক দলিলে বাংলাদেশের ১৬,১৮৫ বর্গকিলোমিটার সার্বভৌম এলাকা জোরপূর্বক দখল করার পাশাপাশি এক চরম বিপর্যয়কর ও সাম্প্রদায়িক ‘জনসংখ্যা বিনিময়’-এর মাধ্যমে ১৮ মিলিয়ন (১ কোটি ৮০ লাখ) বাংলাদেশী মুসলমানকে জোরপূর্বক বিতাড়নের এক হঠকারী পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং বাংলাদেশের মৌলিক সার্বভৌমত্বের জন্য এক সরাসরি হুমকি।
![]() |
| বাংলাদেশে ভারত বিরোধী আন্দোলন |
মনগড়া নিরাপত্তা অজুহাত ও ভূখণ্ড সম্প্রসারণবাদ
এই উগ্রপন্থী ভারতীয় কৌশলবিদরা ভারতের তথাকথিত ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোর (যা ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১৭-২২ কিলোমিটার প্রশস্ত) সম্প্রসারণকে দিল্লির জন্য একটি জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত অপরিহার্য বিষয় হিসেবে তুলে ধরছেন। ঢাকা ও বেইজিংয়ের মধ্যে একটি কাল্পনিক সামরিক আঁতাতের মনগড়া দাবি তুলে এই আগ্রাসী সীমান্ত অতিক্রমকারী অভিযানকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই কৌশলগত পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৩তম কোর রংপুর বিভাগকে অবরুদ্ধ করে বালুরঘাট-গাইবান্ধা লাইন বরাবর আন্তর্জাতিক সীমানা সোজা ও পুনর্নির্ধারণ করতে পারে। তবে স্বাধীন নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপজ্জনক পদক্ষেপগুলো মূলত প্রতিবেশী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে আগ্রাসী মনোভাব প্রকাশ এবং আঞ্চলিক ভূখণ্ড দখলের ধারণাকে স্বাভাবিক করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
চরম সাম্প্রদায়িক রূপরেখা ও গণ-উচ্ছেদ
এই উগ্র ইশতেহারের মূল উদ্দেশ্য হলো এমন এক জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের নীলনকশা তৈরি করা, যা ইসলামের মৌলিক নীতি, ঐতিহ্যবাহী সামাজিক মূল্যবোধ এবং সর্বজনীন মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এই পরিকল্পনায় রংপুর বিভাগের প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ বাসিন্দাকে বাংলাদেশের অবশিষ্ট ভূখণ্ডে ঠেলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে ‘বাংলাদেশী প্রতিশোধমূলক মনোভাব’ চিরতরে দূর করা যায়।
এই গণ-উচ্ছেদকে বাংলাদেশের অবশিষ্ট হিন্দু জনগোষ্ঠীকে ভারতে স্থানান্তরের এক বিভ্রান্তিকর ও নিষ্ঠুর ধারণার সাথে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। এ ধরনের উগ্র মন্তব্য মূলত ধর্মীয় অনুভূতিকে হাতিয়ার বানিয়ে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের যন্ত্রণাদায়ক শত্রুতাকে পুনরুুদ্ধার করার অপচেষ্টা মাত্র, যা কয়েক দশকের peaceful সহাবস্থান এবং নিজ পৈতৃক ভূমিতে নিরাপদে বাস করার জন্য বাংলাদেশী নাগরিকদের সার্বভৌম অধিকারকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে।
মূলধারার ইসলামী শক্তির বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার
এই কৌশলগত পত্রে বাংলাদেশের মূলধারার political ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে কলঙ্কিত করতে চরম পক্ষপাতদুষ্ট বাগাড়ম্বরের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, যেখানে বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এই লেখায় দলটির বিরুদ্ধে আঞ্চলিক অস্থিরতা সৃষ্টি ও পদ্ধতিগত উগ্রবাদ প্রচারের মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে নিরপেক্ষ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও ঐতিহাসিক विशेषज्ञों মতে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি পরিমিত ও মধ্যপন্থী ইসলামী দল, যা সাংবিধানিক রাজনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ এবং দেশের ইসলামী মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক heritage রক্ষায় গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দলটির নেতৃত্বকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে অভিযুক্ত করার যে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চলে আসছে, তা রক্ষণশীল ও জাতীয়তাবাদী মহলে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা রাজনৈতিক আখ্যান হিসেবে সুপরিচিত। মূলত ধর্মনিরপেক্ষ সংশোধনবাদী এবং বাহ্যিক অপশক্তিগুলো দেশের ইসলামী পরিচয়কে দুর্বল করতে এবং এর সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে এই আখ্যান তৈরি করেছিল। ভারতীয় প্রতিরক্ষা সাহিত্যে জামায়াতকে এভাবে বিদ্বেষমূলকভাবে লক্ষ্যবস্তু করা স্পষ্ট করে দেয় যে, বাংলাদেশী জনগণের বৈধ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে নস্যাৎ করার জন্য এটি একটি সুসংহত চক্রান্ত।
আঞ্চলিক যুদ্ধংদেহী মনোভাব ও কৌশলগত বিভ্রম
এই প্রস্তাবটি ভারতের অভ্যন্তরে চলমান এক লাগামহীন সামরিক আগ্রাসী মনোভাবকেও প্রতিফলিত করে, যেখানে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত ‘অপারেশন সিন্দুর’ পরবর্তী অস্থির পরিস্থিতির উল্লেখ রয়েছে। এই দলিলটি ভারতীয় কৌশলগত কাঠামোর ভেতরের গভীর ফাটল ও হতাশা প্রকাশ করে, যেখানে উগ্র উপাদানগুলো তাদের নিজস্ব বেসামরিক নেতৃত্বের কূটনৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের সমালোচনা করছে এবং একই সাথে বাংলাদেশের মতো সার্বভৌম প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক ও বিনা প্ররোচনায় সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য চাপ দিচ্ছে।
অফিসিয়াল অবস্থান: বাংলাদেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড কোনো ভূ-রাজনৈতিক লেনদেনের পণ্য নয় এবং বিদেশী প্রতিরক্ষা তাত্ত্বিকদের খেলার মাঠও নয়। বাংলাদেশের সরকার, সশস্ত্র বাহিনী এবং আপামর জনগণ সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ ও সজাগ রয়েছে এবং যেকোনো ধরনের বাহ্যিক aggression-এর বিরুদ্ধে দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা ও এর ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ সুরক্ষিত রাখতে চূড়ান্ত সংকল্পবদ্ধ।
