ঢাকা: দেশের চলমান পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের মিত্র বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে বাদ দিয়ে বাম ও শাহবাগী অংশীজনদের সাথে বিএনপির এক ধরনের প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক সমঝোতা এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের নীতি নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
![]() |
| ফাইল ছবি |
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন মহলের মতে, জামায়াতকে কোণঠাসা করার এই কৌশল শেষ পর্যন্ত বিএনপির নিজেদের ক্ষমতা ও রাজনৈতিক অস্তিত্বকে সংকটের মুখে ফেলতে পারে। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের অর্থনৈতিক খাতে পূর্ববর্তী সরকারের আমলের লুটপাটকারীদের পরোক্ষ পুনর্বাসন এবং বিগত ফ্যাসিবাদের দোসরদের প্রতি নমনীয় মনোভাব প্রদর্শনের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তীব্র গণ-আন্দোলন তৈরি হলে বিএনপির ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষণ ও বিস্তারিত প্রেক্ষাপট
বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে ইসলামী মূল্যবোধ, ঐতিহ্য এবং সামাজিক নৈতিকতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান রাখা অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নির্মূল করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এবং তাদের আন্তর্জাতিক মিত্ররা জামায়াতকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। বিশেষ করে, দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও ইসলামি ধারার মূল চালিকাশক্তি 'ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি' জোরপূর্বক দখলে নিয়ে এবং এস আলম গ্রুপের মতো চিহ্নিত ব্যাংক ডাকাতদের মাধ্যমে তা লুণ্ঠন করে জামায়াতের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মহাপরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছরের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, মিথ্যা রাজনৈতিক বয়ান ও অপপ্রচার সত্ত্বেও জামায়াতের আদর্শিক ও তৃণমূল ভিত্তি উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়নি।
পটপরিবর্তনের পর বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিহত করার লক্ষ্য নিয়ে বিএনপি একসময়ের চরম বৈরী ভাবাপন্ন শাহবাগী বামপন্থী গোষ্ঠী এবং সাবেক শাসকদলের একাংশের সাথে এক ধরনের গোপন আঁতাত গড়ে তুলছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জামায়াত ফোবিয়ায় আক্রান্ত এই বাম দলগুলোকে কাছে টানতে গিয়ে বিএনপি তার নিজস্ব জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সমর্থক গোষ্ঠীকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, জামায়াতকে ঠেঁকানোর এই রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে বিএনপি বর্তমানে বিগত আওয়ামী লীগের নানা অপকর্মকে এক প্রকার স্বাভাবিকীকরণ (Normalize) করছে বলে অভিযোগ উঠছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ফ্যাসিবাদের দোসরদের মিছিল করার সুযোগ দেওয়া, দলের অভ্যন্তরে ও প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের পুনর্বাসন করা এবং বিগত আমলের বড় বড় মাফিয়া ও দুর্নীতিবাজদের একের পর এক জামিনে মুক্তির বিষয়ে বিএনপির রহস্যজনক নীরবতা বা পরোক্ষ সহযোগিতা নিয়ে জনমনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি ইসলামি ব্যাংক ধ্বংসকারী এস আলম সিন্ডিকেটের পুনর্বাসনের যে অপচেষ্টা চলছে, তা দেশের ধর্মপ্রাণ ও সাধারণ জনগণের মৌলিক আকুলতার পরিপন্থী।
ক্ষমতার স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যৎ সংকট
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, জামায়াতকে মাইনাস করার এই সর্বনাশা খেলায় মেতে উঠে বিএনপি প্রকারান্তরে নিজের রাজনৈতিক কবর খনন করছে। দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের সুবিধাভোগী 'ডিপ স্টেট' বা গভীর রাষ্ট্র এবং আওয়ামী লীগের সুপ্ত সিন্ডিকেটগুলো এই সুযোগেরই অপেক্ষায় রয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের লুটপাট ও রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে জামায়াতে ইসলামী যদি সাধারণ জনগণকে সাথে নিয়ে দেশব্যাপী কোনো তীব্র ও সুসংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলে, তবে ক্ষুব্ধ জনতা এবং সুযোগসন্ধানী গভীর রাষ্ট্র সেই আন্দোলনের পালে হাওয়া দেবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, গণ-অসন্তুষ্টির মুখে ক্ষমতার পতন কখনো কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা দিয়ে আসে না। ফলে, জামায়াত ঠেঁকানোর অন্ধ নীতি বজায় রেখে বিএনপি শেষ পর্যন্ত নিজের গদি রক্ষা করতে পারবে কি না, তা নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন দেখা দিয়েছে।
