আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের কাঁচা চামড়ার বাজার নিয়ে কাটছে না ব্যবসায়ী ও খাতসংশ্লিষ্টদের শঙ্কা। প্রতি বছর সরকারের পক্ষ থেকে চামড়ার ন্যূনতম দাম নির্ধারণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে নজরদারির অভাব, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অসচেতনতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটের কারণে সেই মূল্য কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে দেশের অন্যতম এই জাতীয় সম্পদ রক্ষা এবং এতিমখানা-মাদ্রাসার আর্থিক সচ্ছলতা বজায় রাখতে এবার আগেভাগে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণ প্রশিক্ষণ, বিনামূল্যে লবণ সরবরাহ এবং মোবাইল মনিটরিং টিমসহ ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। এবার একটি চামড়াও যেন নষ্ট না হয়, সেটিকে জাতীয় দায়িত্ব ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
![]() |
| ফাইল ফটো |
উল্লেখ্য, এ বছর ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর কাঁচা চামড়ার দর ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ treasures ৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া ২৫-৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এবার দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, যা চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ বেশি।
সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ ও ধর্মীয় সচেতনতা
ইসলামিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার এবার দেশের সকল মসজিদের খতিব ও ইমামদের মাধ্যমে জুমার খুতবায় চামড়া ছাড়ানো এবং সঠিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরার নির্দেশনা দিয়েছে। চামড়া খাতের গুণগত মান রক্ষায় দেশব্যাপী মাদ্রাসা, এতিমখানা ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে বিনামূল্যে লবণ সরবরাহের জন্য ১৭ কোটিরও বেশি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য মোট ২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে দেশজুড়ে ৩ লাখ পোস্টার ও ৮ লাখ লিফলেট বিতরণসহ গণমাধ্যমে বিশেষ তথ্যচিত্র প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পশুর চামড়া যেন নষ্ট না হয়, সে লক্ষ্যে জবাইয়ের ২ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতি গরুর চামড়ায় ৮ থেকে ১০ কেজি এবং ছাগলের চামড়ায় ৩ থেকে ৪ কেজি লবণ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
ট্যানারি মালিকদের অর্থসংকট ও আড়তদারদের দুশ্চিন্তা
সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে পরিবেশগত মানদণ্ড (সিইটিপি) পুরোপুরি কার্যকর না হওয়া এবং ব্যাংকঋণ সংকটের কারণে অনেক ট্যানারি মালিক আর্থিক চাপে রয়েছেন। বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মঞ্জুরুল হাসান জানান, অনেক ট্যানারি মালিক এখনো বকেয়া টাকা পরিশোধ না করায় চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতিতে ধীরগতি রয়েছে। তদুপরি, লবণের দাম কেজিপ্রতি ২-৩ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় সংরক্ষণ খরচ বেড়েছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত লবণ ও স্থান ছাড়াই চামড়া কেনায় এবং অতিরিক্ত গরম ও বৃষ্টির কারণে এবারও চামড়া পচনের ঝুঁকি রয়েছে। গত বছর প্রায় ২০ শতাংশের বেশি চামড়া নষ্ট হয়েছিল উল্লেখ করে ফিনিশড লেদার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিইও আশরাফ উদ্দিন আহমদ খান সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
বিপাকে মাদ্রাসা ও এতিমখানা
দেশের কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোর বাৎসরিক পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশ আসে কোরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ থেকে। কিন্তু বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা চামড়া সংগ্রহ করলেও অভিজ্ঞতার অভাবে অনেক সময় সঠিকভাবে লবণ দিতে পারে না। তাই শুধু লবণ বিতরণ নয়, প্রশিক্ষিত আলাদা দল দিয়ে তাৎক্ষণিক লবণ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
কঠোর নজরদারির তাগিদ বিশেষজ্ঞদের
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির খান বলেন, চামড়া খাতের এই সংকট উত্তরণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সময়মতো ব্যাংকঋণ প্রদান এবং ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’–এর সনদপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন। তিনি বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
বিসিক চেয়ারম্যান মো. সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বিসিকের সমন্বয়ে দক্ষ কসাইদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে চামড়া ছাড়ানো ও সংরক্ষণের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য রক্ষা করে এই জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
