গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তন, প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং নতুন ন্যারাটিভ (আখ্যান) তৈরির অপচেষ্টা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনিরের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, সংস্কার এবং আগামী দিনের রূপরেখা নিয়ে তাঁর এই পর্যবেক্ষণকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
![]() |
| শিশির মনির |
পটভূমি ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যাত্রা
গত ৫ আগস্ট এক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন সরকারপ্রধানের পলায়ন এবং দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থার পতনের পর দেশ এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল। সেই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেনাপ্রধানের ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল থিওরি’ এবং সর্বদলীয় বৈঠকের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বের খোঁজ শুরু হয়। ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করা হলে, প্রাথমিকভাবে তিনি দায়িত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। তবে দেশের ক্রান্তিলগ্নে এবং ছাত্রদের অনড় দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত তিনি বৈশ্বিক ও শারীরিক নানা সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে এক বিধ্বস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। ভঙ্গুর পুলিশ প্রশাসন, বিপর্যস্ত অর্থনীতি, ভারসাম্যহীন বিদেশনীতি এবং ঋণে জর্জরিত আমলাতন্ত্রের মাঝে চারদিকে অরাজকতা বিরাজ করছিল। এই পরিস্থিতিতে গভীর ধৈর্য ও দিনরাত পরিশ্রমের মাধ্যমে বর্তমান সরকার বিচার, রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও নির্বাচনের পথে হাঁটার চেষ্টা করছে।
নতুন ন্যারাটিভ তৈরির চক্রান্ত ও বর্তমান রাজনৈতিক সংকট
নির্বাচন সম্পন্ন হওয়া এবং কিছু সংস্কার কাজ ঝুলে থাকার প্রেক্ষাপটে বর্তমানে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বর্তমান পরিস্থিতির ওপর কিছুটা ক্ষুব্ধ এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চাপ সৃষ্টি করছে। সংসদ ও সংসদের বাইরে সরকারি এবং বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টা-পাল্টি বক্তব্য দৃশ্যমান হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি বিশেষ মহল প্রফেসর ইউনূস এবং বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক পরিকল্পিত ‘নেতিবাচক ন্যারাটিভ’ বা আখ্যান তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। চক্রান্তকারীরা ধীরে ধীরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ‘অবৈধ ক্ষমতা দখলদার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা, নির্বাচন ও সংসদকে অবৈধ ঘোষণা করা এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে (যেমন ১৯৭১ ও ২০২৪) মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সমাজকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র করছে। এই অপশক্তি মূলত পুরনো ব্যবস্থার দোসর, যারা সুযোগ বুঝে গর্ত থেকে বের হয়ে সমাজ ও রাজনীতিতে পানি মেপে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়।
সংকট উত্তরণে সরকার ও বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান
ইসলামী মূল্যবোধ, সামাজিক স্থিতি এবং ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির সুরক্ষায় দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট দূর করতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে। দেশের চলমান অগ্রযাত্রাকে টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন চক্রান্ত নস্যাৎ করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
বিভাজন পরিহার: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে মুখোমুখি দাঁড় না করিয়ে জাতীয় ঐক্যের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
উন্মুক্ত আলোচনা ও সহযোগিতা: সরকারি ও বিরোধী দলসহ সকল পক্ষকে পারস্পরিক দোষারোপ বন্ধ করে দেশ গঠনে ও ভালো কাজে সহযোগিতা করতে হবে। আলোচনার পথ সবসময় উন্মুক্ত রাখা বাঞ্ছনীয়।
সঠিক বিচার ও সংস্কার: রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে হবে এবং কোনো প্রকার পক্ষপাতিত্ব ছাড়া আইনি প্রক্রিয়া বজায় রাখতে হবে।
দুর্নীতিমুক্ত আধুনিক প্রশাসন: নাগরিক সেবা বৃদ্ধি করতে হবে এবং দুর্নীতি রোধে সব ধরনের সেবা অনলাইন বা ডিজিটালাইজড করা প্রয়োজন।
অর্থনৈতিক স্থীতিশীলতা ও কর্মসংস্থান: ভেঙে পড়া অর্থনীতি পুনর্গঠনে বৈদেশিক নীতি সঠিক রাখা এবং যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
নৈতিকতা ও বিনয়: রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও দায়িত্বশীলদের আচরণে বিনয় বজায় রাখা, ভুল স্বীকার করা এবং নতুন প্রজন্মকে সাথে নিয়ে দেশ পরিচালনায় দূরদর্শিতা দেখানো প্রয়োজন।
জাতীয় ঐতিহ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক নীতিকে সমুন্নত রেখে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে সরকার এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে এই মুহূর্তে অত্যন্ত পরিপক্ব ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। চক্রান্তকারীদের সব ধরনের অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই হোক এই মুহূর্তের প্রধান অঙ্গীকার।
