বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলার জট এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৫০টি ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৪২ হাজার ২৭২টি মামলা পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিষ্পত্তিহীন অবস্থায় ঝুলে আছে।
![]() |
| প্রতীকি ছবি |
উদ্বেগের বিষয় হলো, অপরাধের ভয়াবহতা ও মামলার পাহাড়সম সংখ্যা সত্ত্বেও গত ১৮ বছরে দেশে মাত্র পাঁচজন ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে। বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা এবং উচ্চ আদালতে আপিল নিষ্পত্তির ধীরগতির কারণে অপরাধীরা এক প্রকার দায়মুক্তির সংস্কৃতিতে পার পেয়ে যাচ্ছে, যা সমাজদেহে গভীর ক্ষত তৈরি করছে।
বিচারহীনতার দীর্ঘ মিছিল
২০১৬ সালে কুমিল্লায় তনু হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ২০২৫ সালে মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা—দেশের প্রতিটি ঘটনা ন্যায়বিচারের আশায় মানুষের হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে। তনু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, আছিয়া হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও উচ্চ আদালতে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় রায় কার্যকর করা যাচ্ছে না। নোয়াখালীর সুবর্ণচরে গৃহবধূ ধর্ষণ বা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোচিত গণধর্ষণ মামলার মতো ঘটনাগুলোও উচ্চ আদালতের আপিল ও ডেথ রেফারেন্সের জটিলতায় থমকে আছে।
দুর্বল তদন্ত ও সাক্ষীর নিরাপত্তা সংকট
আইনজীবীরা ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রতার পেছনে প্রধান অন্তরায় হলো ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত। ঘটনার পর সময়মতো ফরেনসিক বা ডিএনএ পরীক্ষা না হওয়া এবং পুলিশের অসম্পূর্ণ চার্জশিটের কারণে আদালতে অপরাধী প্রমাণ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। এছাড়া দেশে সুনির্দিষ্ট ‘সাক্ষী সুরক্ষা আইন’ না থাকায় প্রভাবশালী মহলের ভয়ভীতি ও হুমকির মুখে সাক্ষীরা আদালতে আসতে সাহস পান না। ফলে প্রমাণের অভাবে প্রায় ৭০ থেকে ৯৭ শতাংশ মামলায় আসামিরা খালাস পেয়ে যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় দণ্ড কার্যকর হওয়ার হার মাত্র ৩ শতাংশ।
আইনি সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জ
আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিচারক সংকট ও বারবার শুনানির তারিখ পেছানোর ফলে গড়ে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে ৩ থেকে ৫ বছর সময় লেগে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে অপরাধের সাজা বৃদ্ধি করা হলেও শুধুমাত্র আইনের পরিবর্তন যে জট কমাতে যথেষ্ট নয়, তা বিশেষজ্ঞরাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন। ভারত বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলো ফাস্ট ট্র্যাক বিশেষ আদালত ও সংকট নিরসনে আলাদা সেল গঠন করে যে উদ্যোগ নিয়েছে, বাংলাদেশে সেই ধরনের কাঠামোগত সক্ষমতা ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার অভাব প্রকট।
প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা
সরকারের পক্ষ থেকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় গতি আনার নানা উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে। ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এস.এম ইউনুস আলী রবি জানিয়েছেন, সরকার লোকবল নিয়োগ, পুলিশের তদন্তের মানোন্নয়ন এবং সাক্ষীদের সময়মতো উপস্থিত নিশ্চিত করার মাধ্যমে মামলার জট কমাতে সচেষ্ট। তবে সচেতন মহল মনে করে, কেবল প্রশাসনিক ঘোষণা বা আইনি সংশোধনীই যথেষ্ট নয়; বিচার বিভাগের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং প্রতিটি মামলার প্রতিটি ধাপ সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করার কঠোর জবাবদিহি না থাকলে বিচারহীনতার এই চক্র ভাঙা অসম্ভব।
বিচার প্রক্রিয়ার এই স্থবিরতা কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকেই আর্থিকভাবে নিঃস্ব ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করছে না, বরং অপরাধীদের মাঝে এক ধরনের বেপরোয়া মানসিকতা তৈরি করছে। সঠিক সময়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করা গেলে সমাজের নৈতিক ভীত ও নিরাপত্তার সংহতি রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
