ভারতের মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত ঐতিহাসিক কামাল মাওলা মসজিদকে হাইকোর্টের নির্দেশে মন্দিরে রূপান্তরের ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে মুসলিম সম্প্রদায় ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় আট দশক ধরে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালনকারী মোহাম্মদ রফিকের মতো স্থানীয়দের জন্য এই রায় এক অপূরণীয় আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে। ১৯৪৭ সালের আগে থেকেই তাঁর পরিবারের তত্ত্বাবধানে থাকা এই পবিত্র স্থাপনাটি হাতছাড়া হওয়ায় স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
![]() |
| ভারতে হিন্দুদের মসজিদ দখল |
রায় ও তার প্রেক্ষাপট
দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর দাবির প্রেক্ষিতে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এএসআই)-এর বিতর্কিত জরিপকে ভিত্তি ধরে আদালত এই রায় প্রদান করেছেন। হাইকোর্ট পুরো কমপ্লেক্সটিকে জ্ঞান ও বাণীর দেবী ‘বাগদেবী’র মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে সেখানে নামাজ আদায়কারী মুসলিমদের আবেদন খারিজ করে তাঁদের জন্য অন্যত্র মসজিদ নির্মাণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আইনি ও ঐতিহাসিক অসঙ্গতি
মুসলিম পক্ষের আইনজীবী আশহার ওয়ারসি এই রায়কে ভারতের ‘উপাসনালয় আইন, ১৯৯১’-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, ১৯৩৫ সালের সরকারি গেজেটে জায়গাটিকে মসজিদ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, যা আদালত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে। এছাড়া, মন্দিরের অংশ হিসেবে যে মূর্তিকে কেন্দ্র করে বিতর্ক, সেটির ঐতিহাসিক উৎস নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশা রয়েছে। ১৮৭৫ সালের নথিপত্র অনুযায়ী, ওই মূর্তিটি মূলত ধার শহরের ‘সিটি প্যালেস’ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, কামাল মাওলা মসজিদ থেকে নয়। ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকে সহ বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ আদালতের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত এএসআইয়ের জরিপকে নিম্নমানের এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্যগুলোকে মন্দির দাবি করার এই প্রবণতা ২০১৪ সালের পর থেকে চরম আকার ধারণ করেছে। তাজমহলের মতো বিশ্বখ্যাত স্থাপনার নিচেও মন্দিরের অস্তিত্ব খোঁজার দাবি এ ধরনের চরমপন্থী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এ রায়কে ২০১৯ সালের বাবরি মসজিদ রায়ের একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে উল্লেখ করে অভিযোগ করেছেন যে, এএসআই এখন হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে।
ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সংহতি
এই রায় ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের অস্তিত্ব ও তাঁদের উপাসনালয়ের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের সংকটের জন্ম দিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের খেলা শুরু হয়েছে, তা দেশটির অভ্যন্তরীণ শান্তি ও সামাজিক সংহতিকে মারাত্মকভাবে বিপন্ন করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মুসলিম পক্ষ ইতিমধ্যেই এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছে, যা এখন ভারতের বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর একটি বড় পরীক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে।
এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতা ভারতের ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সাংবিধানিক মূল্যবোধকে কোথায় নিয়ে গিয়ে থামাবে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
