জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের মধ্যে বরাদ্দ প্রদান নিয়ে সৃষ্ট সাম্প্রতিক বৈষম্য দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। ৫০ জন নারী সদস্যের মধ্যে ৩৭ জনকে বরাদ্দ প্রদান এবং বাকি ১৩ জনকে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে বঞ্চিত রাখার ঘটনাটি কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এক অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে।
![]() |
| নারী এমপিদের একাংশ: ছবি সংগৃহিত |
সংসদীয় গণতন্ত্রে উন্নয়ন বরাদ্দের বণ্টন একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া, যা দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের সেবার ব্রত নিয়ে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু মাত্র ১৩ জন সদস্যকে তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার এই সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে সেই পুরোনো কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির প্রতিফলন, যেখানে ভিন্নমতকে শত্রুতা হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, জুলাই বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই সংসদেও এমন বিভাজনমূলক মানসিকতা দৃশ্যমান, অথচ সেই জুলাইয়ের শহীদের পরিবারের সদস্য এবং বিপ্লবের অংশীদার নারীরাও আজ এই বৈষম্যের শিকার।
সংসদীয় কার্যক্রমের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতা। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নারী সদস্যরা একই ছাদের নিচে সহাবস্থান করেন, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিতর্ক করেন এবং দেশের কল্যাণে কাজ করেন। যখন কোনো একটি বিশেষ পক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করে সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়, তখন তা কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে না, বরং সংসদীয় সম্প্রীতির পরিবেশকেও নষ্ট করে।
সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তখন দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সব জনপ্রতিনিধিকে সমান চোখে দেখা তাদের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু সংসদীয় বরাদ্দে এই ধরনের সংকীর্ণ ও বৈষম্যমূলক আচরণ সমাজে সহনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির যে প্রত্যাশা, তাকে চরমভাবে ব্যাহত করছে। যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্বে আছেন, তাদের উচিত দ্রুত এই সংকীর্ণ রাজনীতির বলয় থেকে বেরিয়ে এসে গণতান্ত্রিক চর্চাকে সুসংহত করা। প্রকৃত গণতন্ত্রের দাবি হলো—ভিন্নমত থাকবে, কিন্তু তা যেন কখনোই অধিকার আদায়ের বা প্রাপ্য সুবিধার অন্তরায় না হয়। সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের চেয়ে রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সকল জনপ্রতিনিধির প্রতি সমমর্যাদা বজায় রাখাই হোক নতুন বাংলাদেশের আগামীর পথচলা।
