ব্রেকিং নিউজ
লোডিং হচ্ছে...

সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও আল্লামা মওদুদীর লেখনীর অবিস্মরণীয় প্রভাব

বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ ও সংস্কারক আল্লামা সাইয়েদ আবুল আ'লা মওদুদী (রহ.) তাঁর কালজয়ী তাফসির গ্রন্থ 'তাফহীমুল কুরআন'-এ সাহাবায়ে কেরামের শানে যে বিশ্লেষণ ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন, তা আজও বিশ্বাসী হৃদয়ে শিহরণ জাগায়। সূরা আল-ফাতাহ-এর ২৯ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি সাহাবায়ে কেরামের সামগ্রিক চরিত্রের যে চিত্রায়ন করেছেন, তা কেবল বস্তুনিষ্ঠই নয়, বরং হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত এক পরম ভক্তি ও ঈমানি আকীদার প্রতিফলন।

সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা ও আল্লামা মওদুদীর লেখনীর অবিস্মরণীয় প্রভাব
আবুল আলা মওদুদী রাহিমাহুল্লাহ

সাহাবায়ে কেরাম: মানবতার উজ্জ্বলতম নক্ষত্রপুঞ্জ

আল্লামা মওদুদী (রহ.) সাহাবায়ে কেরামকে ইসলামের সেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী আলোকবর্তিকা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যাদের জীবনধারা ছিল সরাসরি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সাহচর্যের ফসল। তাঁর লেখনীর সেই অংশটি কেবল একটি টীকা নয়, বরং ইতিহাসের এক অকাট্য সত্যের প্রকাশ:

"রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সঙ্গী সাথীরা (সাহাবারা) এমন যে, কেউ তাদের একবার দেখা মাত্রই বুঝতে পারবে যে তারা সৃষ্টির সেরা। কারণ, তাদের চেহারায় আল্লাহ-ভীরুতার দীপ্তি সমুজ্জ্বল।" (তাফহীমুল কুরআন, সূরা ফাতাহ, টীকা-৫৪)

এই ছোট্ট একটি বাক্যের মাঝে তিনি সাহাবায়ে কেরামের ব্যক্তিত্বের যে সারসংক্ষেপ টেনেছেন, তা অতুলনীয়। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, তাঁদের পবিত্র সান্নিধ্য কোনো সাধারণ মানবিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে ছিল; তা ছিল নবুয়তের নূরে আলোকিত একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক অবস্থান। আল্লাহভীতি বা 'তাকওয়া' যখন কোনো মানুষের অস্তিত্বের গভীরে প্রোথিত হয়, তখন তার বাহ্যিক অবয়বে যে প্রশান্তি ও তেজ ফুটে ওঠে, সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন তারই বাস্তব উদাহরণ।

সত্যের পথে প্রতিকূলতা ও মিথ্যার আগ্রাসন

ইসলামী ইতিহাসের এক মহৎ ব্যক্তিত্ব ও চিন্তাবিদ হওয়া সত্ত্বেও, আল্লামা মওদুদী (রহ.) তাঁর জীবদ্দশায় এবং পরবর্তী সময়ে চরম বিদ্বেষ ও মিথ্যাচারের শিকার হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অধিকাংশ অপপ্রচারই মূলত ইসলামের মৌলিক ও ঐতিহ্যবাহী চিন্তাধারাকে কলঙ্কিত করার এক সূক্ষ্ম কৌশল। বিশেষ করে সাহাবায়ে কেরামের মর্যাদা সম্পর্কে তাঁর অবস্থানকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে একটি শ্রেণি নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টা করেছে।

আল্লামা মওদুদী (রহ.) সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা তো দূরের কথা, বরং ইতিহাসের বিভিন্ন সন্ধিক্ষণে তাঁদের মর্যাদা ও অবস্থানকে সমুন্নত রাখতে নিরলস কাজ করেছেন। যারা তাঁর বিরুদ্ধে জঘন্য অপবাদ রটায়, তারা মূলত তাঁর গবেষণালব্ধ সত্যকে এড়িয়ে গিয়ে সংকীর্ণ রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক বৈরিতার পরিচয় দেয়। তাঁর লেখা পড়লে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, সাহাবায়ে কেরামের প্রতি তাঁর হৃদয়ে কী গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা বিদ্যমান ছিল।

কেন আল্লামার লেখনী অম্লান?

আল্লামা মওদুদী (রহ.)-এর লেখনী কেন আজও মানুষকে তাড়িত করে, তার মূল কারণ তাঁর লেখনীতে নিহিত থাকা 'হক' বা সত্যের নূর। তিনি এমন এক সময়ে ইসলামকে নতুন করে আধুনিক শিক্ষিত সমাজের কাছে উপস্থাপন করেছেন, যখন ইসলামের সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধগুলো অবমূল্যায়িত হচ্ছিল। সাহাবায়ে কেরামকে কেন্দ্র করে তাঁর প্রতিটি বিশ্লেষণ ছিল কুরআন ও সুন্নাহর গভীর জ্ঞানের আলোকে উদ্ভাসিত।

তাঁর এই অনন্য অবদানের কারণেই বিংশ শতাব্দীর সেই উত্তাল সময়ে তিনি মুসলিম উম্মাহর হারানো আত্মপরিচয় খুঁজে পেতে সাহায্য করেছেন। সাহাবায়ে কেরামের সেই সোনালী প্রজন্মের আদর্শকে যদি আজ আমরা নতুন করে অনুধাবন করতে চাই, তবে আল্লামা মওদুদী (রহ.)-এর মতো চিন্তাবিদদের লেখনী আমাদের কাছে দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।

পরিশেষে বলা যায়, আল্লামা মওদুদী (রহ.)-এর বিরুদ্ধে সকল অপপ্রচার সময়ের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে, কিন্তু সাহাবায়ে কেরামের শানে তাঁর রেখে যাওয়া এই কালজয়ী উক্তিগুলো ইতিহাসের পাতায় ও মুমিনের হৃদয়ে চিরকাল উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় ভাস্বর হয়ে থাকবে। সত্যের সুর কখনোই চিরস্থায়ীভাবে চাপা পড়ে থাকতে পারে না, কারণ তা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা হেদায়েতেরই একটি অংশ।

শেয়ার করুন:

নামাজের সময় (ঢাকা)
লোড হচ্ছে...