ব্রেকিং নিউজ
লোডিং হচ্ছে...

পারমাণবিক মহাপ্রলয়: ঢাকা বা দিল্লির মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে পারমাণবিক হামলা হলে মানুষের কি হবে!?

একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ কোনো সাধারণ বোমার মতো শব্দ দিয়ে শুরু হয় না। বরং সূর্যের চেয়েও উজ্জ্বল এক আলোর ঝলকানি দিয়ে আকাশ মুহূর্তেই সাদা হয়ে যায়। ঢাকা বা দিল্লির মতো শহরে যেখানে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় থাকে, সেখানে এই আলো দেখা মানেই কয়েক সেকেন্ডে অন্ধ হয়ে যাওয়া। কারণ এই প্রচণ্ড তাপীয় বিকিরণ চোখের রেটিনা পুড়িয়ে দেয়। যারা বিস্ফোরণ কেন্দ্র থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকবেন, তাদের শরীরও মোমের মতো গলে যেতে শুরু করবে। এই নীরব ঘাতক আলোর গতিতে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের বাঁচার সব পথ বন্ধ করে দেয়।

একটা পারমাণবিক বিস্ফোরণের কাল্পনিক ছবি
অগ্নিগোলক এবং বাষ্পীভূত শহর

বিস্ফোরণের ঠিক পরেই তৈরি হয় একটি বিশালাকার আগুনের গোলক। এর ভেতরের তাপমাত্রা কয়েক কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায় যা কল্পনা করাও কঠিন। তাই এই গোলকের সীমানার মধ্যে থাকা দালানকোঠা, গাড়ি এবং মানুষ মুহূর্তে বাষ্পে পরিণত হয়। কারণ কোনো পদার্থই এই প্রচণ্ড উত্তাপ সহ্য করার ক্ষমতা রাখে না। ঢাকা বা দিল্লির ঘিঞ্জি গলিগুলোতে এই আগুন বাতাসের অক্সিজেন চুষে নেবে। তাই যারা সরাসরি আগুনে পুড়বেন না, তারা অক্সিজেনের অভাবে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবেন।

শকওয়েভ বা ধ্বংসাত্মক বায়ুচাপ

আগুনের গোলকের পরেই আসে বাতাসের এক বিশাল দেয়াল বা শকওয়েভ। এই প্রচণ্ড বায়ুচাপ শব্দের চেয়েও দ্রুত গতিতে চারদিকে আছড়ে পড়ে। যেহেতু আমাদের শহরগুলোতে ভবনগুলো খুব কাছাকাছি তৈরি, তাই একটি তাসের ঘরের মতো অন্যটির ওপর আছড়ে পড়বে। কংক্রিটের বড় বড় খণ্ডগুলো তখন কামানের গোলার মতো বাতাসে উড়তে থাকবে। মানুষ এই বাতাসের ধাক্কায় কয়েকশ ফুট দূরে ছিটকে পড়বে। তাই এই যান্ত্রিক আঘাত থেকে বাঁচার মতো মজবুত কাঠামো আমাদের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে খুব কমই আছে।

আগুনের ঝড় বা ফায়ারস্টর্ম

বিস্ফোরণ পরবর্তী সময়ে শহরজুড়ে হাজার হাজার অগ্নিকাণ্ড শুরু হবে। কারণ গ্যাস লাইন ফেটে যাওয়া এবং বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট পুরো এলাকাকে নরক বানিয়ে দেবে। এই ছোট ছোট আগুনগুলো মিলে একটি বিশাল 'ফায়ারস্টর্ম' বা আগুনের ঝড় তৈরি করে। এই ঝড় এতটাই শক্তিশালী হয় যে এটি চারপাশের বাতাসকে নিজের দিকে টেনে নেয়। তাই যারা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে থাকবেন, তাদের উদ্ধার করার কোনো সুযোগ থাকবে না। বরং আগুনের এই লেলিহান শিখা মাইলের পর মাইল এলাকা ছাই করে দেবে।

তেজস্ক্রিয় ধূলিকণা বা ফলআউট

পারমাণবিক বোমার সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ হলো এর অদৃশ্য তেজস্ক্রিয়তা। বিস্ফোরণের পর মাটি ও ধুলোবালি তেজস্ক্রিয় হয়ে আকাশে উঠে যায়। পরে এই বিষাক্ত ধুলোবালি 'ব্ল্যাক রেইন' বা কালো বৃষ্টির মাধ্যমে মাটিতে ফিরে আসে। কারণ এই কণাগুলো মানুষের কোষের ডিএনএ নষ্ট করে দেয়। তাই যারা প্রাথমিক বিস্ফোরণে বেঁচে যাবেন, তারাও বমি, রক্তপাত এবং চুল পড়ার মতো উপসর্গে আক্রান্ত হবেন। এই অদৃশ্য ঘাতক থেকে বাঁচার জন্য কয়েক ফুট পুরু কংক্রিটের দেয়াল ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মৃত্যু

একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ থেকে 'ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক পালস' (EMP) তৈরি হয়। এই তরঙ্গ মুহূর্তের মধ্যে শহরের সব মোবাইল ফোন, কম্পিউটার এবং বিদ্যুৎ গ্রিড পুড়িয়ে দেয়। কারণ আমাদের আধুনিক জীবন পুরোপুরি ইলেকট্রনিক্সের ওপর নির্ভরশীল, তাই আমরা মুহূর্তেই আদিম যুগে ফিরে যাব। আপনি কাউকে সাহায্য করার জন্য ফোন করতে পারবেন না। এমনকি গাড়ির ইঞ্জিনও অকেজো হয়ে যেতে পারে কারণ আধুনিক গাড়িতে চিপ ব্যবহার করা হয়। তাই পুরো শহর একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হবে যেখানে কোনো তথ্য পৌঁছাবে না।

স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিপর্যয়

ঢাকা বা দিল্লির মতো শহরে সাধারণ সময়েই হাসপাতালে জায়গা পাওয়া কঠিন। একটি পারমাণবিক হামলার পর যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ দগ্ধ হয়ে হাসপাতালে আসবে, তখন পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। কারণ ডাক্তার এবং নার্সদের বড় অংশই হয়তো মারা যাবেন অথবা আহত হবেন। অধিকাংশ হাসপাতাল ধ্বংস হয়ে যাবে অথবা তেজস্ক্রিয়তায় দূষিত হবে। তাই প্রয়োজনীয় ওষুধ বা যন্ত্রপাতির অভাবে সাধারণ ক্ষত থেকেও মানুষের মৃত্যু ঘটবে। বরং পচনশীল মৃতদেহের স্তূপ থেকে মহামারীর আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যাবে।

পানীয় জল ও খাদ্যের সংকট

বিস্ফোরণের পর শহরের সব উন্মুক্ত পানির উৎস তেজস্ক্রিয় হয়ে যাবে। কারণ পানির ভেতরে মিশে যাওয়া বিষাক্ত কণাগুলো সাধারণ ফিল্টারে দূর করা সম্ভব নয়। খাদ্যের গুদামগুলো ধ্বংস হবে অথবা বিষাক্ত ধুলোয় ঢেকে যাবে। তাই কয়েক দিনের মধ্যেই চরম দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। মানুষ তৃষ্ণার্ত হয়ে বিষাক্ত পানি পান করতে বাধ্য হবে এবং দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। কৃষি জমিগুলো দশকের পর দশক ধরে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে থাকবে কারণ তেজস্ক্রিয়তা মাটিতে মিশে যায়।

মানসিক ট্রমা এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা

বেঁচে থাকা মানুষের জন্য এই পৃথিবী হবে এক দুঃস্বপ্নের মতো। কারণ তারা তাদের প্রিয়জনদের চোখের সামনে হারিয়ে যেতে দেখবেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের জীবন বাঁচাতে ব্যস্ত থাকবে, ফলে শহরে লুটতরাজ শুরু হতে পারে। মানুষ খাবারের জন্য একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে কারণ বেঁচে থাকার আদিম প্রবৃত্তি তখন জয়ী হবে। এই মানসিক আঘাত থেকে সেরে ওঠা কয়েক প্রজন্মের পক্ষেও সম্ভব নয়। বরং পুরো সামাজিক কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।

নিউক্লিয়ার উইন্টার বা পারমাণবিক শীত

বিস্ফোরণের ধোঁয়া যখন আকাশের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছাবে, তখন তা সূর্যের আলোকে পৃথিবীতে আসতে বাধা দেবে। এর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা নাটকীয়ভাবে কমে যাবে। ঢাকা বা দিল্লির মতো উষ্ণ অঞ্চলেও হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা নেমে যেতে পারে। তাই কোনো ফসল ফলবে না এবং প্রাণিজগৎ ধ্বংসের মুখে পড়বে। এই দীর্ঘমেয়াদী শীত কয়েক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। তাই যারা বোমা থেকে বাঁচবেন, তারা হয়তো এই বৈশ্বিক ঠান্ডায় প্রাণ হারাবেন।

পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত

তেজস্ক্রিয়তা কেবল মানুষকে নয়, প্রাণিকুল ও উদ্ভিদকেও ধ্বংস করে। কারণ বিকিরণের ফলে গাছের পাতা ঝরে যায় এবং প্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়। ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে আসবে। তাই যারা ঘরের বাইরে বের হবেন, তাদের ত্বকের ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কয়েকশ গুণ বেড়ে যাবে। প্রকৃতির এই ভারসাম্য ফিরে আসতে শত শত বছর সময় লেগে যেতে পারে। তাই একটি পারমাণবিক যুদ্ধ মানে প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক চরম অপরাধ।

বাঁচার লড়াই ও আগাম প্রস্তুতি

এত ধ্বংসের মাঝেও বেঁচে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয় সঠিক জ্ঞানের মাধ্যমে। আপনার যদি একটি জরুরি কিট থাকে যেখানে শুকনো খাবার ও পানি আছে, তবে আপনি প্রথম কয়েক দিন টিকে থাকতে পারেন। মাটির নিচের বেজমেন্ট বা কংক্রিটের মজবুত দালান তেজস্ক্রিয়তা থেকে ঢাল হিসেবে কাজ করে। তবে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি হলো শান্তি বজায় রাখা। কারণ যুদ্ধের কোনো জয়ী পক্ষ নেই, বরং আছে শুধু ধ্বংসের দীর্ঘ ইতিহাস। তাই মানবতাকে বাঁচাতে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণই হলো একমাত্র চূড়ান্ত সমাধান।


শেয়ার করুন:

নামাজের সময় (ঢাকা)
লোড হচ্ছে...