ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে আমলাতন্ত্রের আনুগত্য পরিবর্তনের এক করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন সদ্য সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন। কারণ তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, ১৮ মাস দায়িত্বে থাকাকালীন যেসব কর্মকর্তা অত্যন্ত বিনীত ও অনুগত ছিলেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের পর তারা দ্রুতই দূরে সরে গেছেন। তিনি মনে করেন, আমাদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ব্যক্তি বা নীতির চেয়ে ‘ক্ষমতার কেন্দ্র’ বেশি গুরুত্ব পায়। তাই ড. খালিদ হোসেনের এই ফেসবুক পোস্টটি বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে এক গভীর আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
![]() |
| এ এফ এম খালিদ হোসেন, সাবেক উপদেষ্টা |
ক্ষমতা যেখানে, আনুগত্যও সেখানে স্থানান্তরিত হওয়াকে রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামোর একটি পুরোনো সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন সাবেক এই উপদেষ্টা। কারণ প্রশাসনের একটি বড় অংশ মনে করে, তাদের প্রধান দায়িত্ব হলো বর্তমান ক্ষমতাসীন ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট রাখা। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, নতুন প্রভুর সন্তুষ্টি অর্জনের ব্যস্ততায় আমলারা প্রায়ই পুরোনো পেশাদার সম্পর্কগুলো ভুলে যান। তাই প্রশাসনের এই নিরপেক্ষতা হারানো রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন এমন এক আমলাতন্ত্র, যা ব্যক্তির বদলে সংবিধান ও নীতির প্রতি অনুগত থাকবে।
দক্ষ কর্মকর্তাদের ওএসডি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ধর্ম সচিবসহ বেশ কয়েকজন দক্ষ কর্মকর্তাকে ওএসডি করার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ড. খালিদ। কারণ সংশ্লিষ্ট সচিবের দক্ষতা ও সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন না থাকলেও তাকে কেবল রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এই কর্মকর্তা বিগত আওয়ামী লীগ আমলেও আট বছর ওএসডি ছিলেন এবং জাতীয়তাবাদী শক্তি ক্ষমতায় আসার পরও একই ভাগ্যের শিকার হলেন। তাই দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের এভাবে অবমূল্যায়ন করা রাষ্ট্রের মূল্যবান মানবসম্পদ নষ্ট করার শামিল।
দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি বনাম প্রশাসনিক পেশাদারিত্ব
প্রশাসনে দলীয় আনুগত্যকে মূল্যায়নের মাপকাঠি করা হলে কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভয় পান। কারণ যখন কর্মকর্তাদের মনে হয় যে পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ই বড়, তখন তারা নিরপেক্ষ থাকার সাহস হারান। ড. খালিদ হোসেন বিশ্বাস করেন যে, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অবশ্যই প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং তাদের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, প্রশাসনে বিভাজন সৃষ্টি হবে যা শেষ পর্যন্ত সরকারের নীতি বাস্তবায়নেই বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
মেধা ও সততার মূল্যায়নের অনন্য উদাহরণ
নেতিবাচক বাস্তবতার মধ্যেও প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন ড. খালিদ হোসেন। কারণ প্রধান উপদেষ্টা একজন অত্যন্ত মেধাবী ও প্রোঅ্যাকটিভ সচিবকে অবসরের পর একটি সাংবিধানিক পদে নিয়োগ দিয়ে মেধার সঠিক মূল্যায়ন করেছেন। এই ধরনের সিদ্ধান্ত তরুণ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয় যে, সততা ও নিষ্ঠা শেষ পর্যন্ত মূল্যায়িত হয়। তাই প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন এনে রাষ্ট্রকে ব্যক্তি-নির্ভর আনুগত্যের সংস্কৃতি থেকে বের করে আনতে হবে।
