সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই নির্বাচন কতটুকু অন্তর্ভুক্তিমূলক হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, নির্বাচনে প্রায় ২১ দশমিক ৪ শতাংশ জাল ভোট পড়েছে এবং ৯৯ শতাংশ প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ও হলফনামাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ’ তুলে ধরার সময় এসব তথ্য জানানো হয়।
নির্বাচনের পরিবেশ ও অনিয়ম
টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, নির্বাচনের শুরুতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার আভাস মিললেও শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা পুরোনো অগণতান্ত্রিক চর্চাই বজায় রেখেছেন। বিশেষ করে অর্থ, পেশিশক্তি এবং ধর্মের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
অনিয়মের পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়:
নির্বাচনে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ জাল ভোট পড়েছে।
১৪ দশমিক ৩ শতাংশ কেন্দ্রে প্রতিপক্ষের এজেন্টদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ১২৫টি।
ইসি ও আচরণবিধি
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রসঙ্গে টিআইবি জানায়, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে কমিশনের প্রচেষ্টা দৃশ্যমান ছিল। তবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং কমিশনের নিজস্ব সক্ষমতার ঘাটতির কারণে আচরণবিধি লঙ্ঘন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। পর্যবেক্ষণে বলা হয়, নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৯৯ শতাংশ প্রার্থী আচরণবিধির ৫৮টি বিষয়ের মধ্যে কোনো না কোনোটি লঙ্ঘন করেছেন।
আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তি প্রসঙ্গ
আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে নির্বাচন কতটুকু অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক হলো কি না’ এ নিয়ে আরো প্রশ্ন উঠবে।”
তবে ভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, “তৃণমূল পর্যায়ে অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ধানের শীষ বা দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিতে বলেছিলেন এবং তারা ভোট দিয়েছেন। তাই আওয়ামী লীগের শতভাগ নেতাকর্মী ভোট দেননি, এটা বলার সুযোগ নেই।”
সার্বিকভাবে নির্বাচনকে ‘গ্রহণযোগ্য মাত্রায় সুষ্ঠু’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের পর্যালোচনায় নির্বাচনে কোনো ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা কাঠামোগত কারচুপির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ঋণগ্রস্ত প্রার্থী প্রসঙ্গ
বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে ঋণগ্রস্তদের বিষয়টি উঠে এলে ড. ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট করেন যে, আইন অনুযায়ী ঋণগ্রস্ত এবং ঋণখেলাপি এক বিষয় নয়। নির্বাচিতদের অনেকেই ঋণগ্রস্ত হতে পারেন, তবে তারা ঋণখেলাপি নন।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, পতিত কর্তৃত্ববাদী শক্তির নির্বাচনবিরোধী তৎপরতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তঃদলীয় কোন্দল ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ ও অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছিল, যা নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও অব্যাহত রয়েছে।
