ঢাকা, ১৬ জুন ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দীর্ঘদিনের মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল স্পষ্ট হয়ে উঠছে। লেবাননে সামরিক অভিযান ও ইরানের সঙ্গে কৌশলগত অবস্থান নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিকেই যেন প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
![]() |
| ছবি: সংগৃহিত |
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘমেয়াদী কৌশল ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে সাথে নিয়ে ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের ওপর সর্বাত্মক চাপ প্রয়োগ করা এবং এই জোটকে কেন্দ্র করে পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েলের প্রভাব বলয় শক্তিশালী করা। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই নেতানিয়াহু তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান সংহত করতে চেয়েছিলেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে নিজেকে সরিয়ে আনতে এবং দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে, যা নেতানিয়াহুর কৌশলগত লক্ষ্যের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওয়াশিংটন সম্প্রতি লেবাননে ৬০ দিনের একটি বর্ধিত যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সামনে এনেছে, যার লক্ষ্য হলো এই সময়ের মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও অন্যান্য নিরাপত্তা ইস্যুতে আলোচনার সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকদের মতে, এই প্রস্তাব ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। শীর্ষ ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি মূলত ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতাকে সীমিত করার এবং ইরান সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অপারেশন চালানোকে বাধাগ্রস্ত করার একটি কৌশল হিসেবে কাজ করবে।
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মধ্যে টেলিফোন আলাপ অত্যন্ত তিক্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। বিশেষ করে লেবাননের বৈরুতে সামরিক আঘাত হানা থেকে বিরত থাকার বিষয়ে ট্রাম্পের কঠোর নির্দেশ এবং নেতানিয়াহুর অনড় অবস্থান দুই নেতার মধ্যকার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দূরত্বকে প্রকট করেছে।
ইসরায়েলি সরকারের অভ্যন্তরে এখন চরম হতাশা বিরাজ করছে। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের গৃহীত নীতি ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে। একদিকে লেবাননের হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখা এবং অন্যদিকে প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা—এই দ্বিমুখী চাপের মুখে পড়েছে নেতানিয়াহুর প্রশাসন।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত, ইসরায়েলের জন্য এই মুহূর্তটি অত্যন্ত নাজুক। একদিকে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব কমানোর চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের সাথে ক্রমবর্ধমান দূরত্ব সামলানো। আপাতদৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের কোনো সম্ভাবনা না থাকলেও, এই মতবিরোধ পশ্চিম এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগামী দিনে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে এই কৌশলগত সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়।
