সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমের প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘ কয়েকদিনের আলোচনা ও বিতর্কের অবসান ঘটল। হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগে ঐতিহাসিক এবং সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে শেষ পর্যন্ত দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার হলেন তিনি। সোমবার (২২ জুন) গভীর রাতে দায়িত্ব হস্তান্তর শেষে মঙ্গলবার তিনি সিলেট ত্যাগ করেন।
![]() |
| ফাইল ফটো |
মাজারের ইতিহাসে নজিরবিহীন স্বচ্ছতা
শত শত বছরের প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে ডিসি সারওয়ার আলমের উদ্যোগেই প্রথমবারের মতো মাজারের দানের অর্থ প্রকাশ্যে গণনার নজির স্থাপিত হলো। প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে গত বৃহস্পতিবার মাজারের তিনটি বড় দানপাত্র বা 'ডেগ' সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়েছিল। সোমবার দুপুরে জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সেসব দানপাত্র ও বাক্স খোলা হয়।
গণনা শেষে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা এবং ৭ আনা স্বর্ণসহ কিছু বিদেশি মুদ্রা পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মাজারের নামে সোনালী ব্যাংকে খোলা নতুন অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মাত্র তিন-চার দিনে প্রাপ্ত এই অর্থের পরিমাণ ইঙ্গিত দেয় যে, মাজারের বার্ষিক আয়ের অংকটি অত্যন্ত বিশাল, যা এতদিন যথাযথ ব্যবস্থাপনার আওতাধীন ছিল না।
প্রত্যাহার ও জনগণের প্রতিক্রিয়া
গত রবিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে ডিসি সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহারের আদেশ দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে সিলেটজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একদিকে মাজারসংশ্লিষ্টরা এই পদক্ষেপকে 'ঐতিহ্য ও মাজার সংস্কৃতিবিরোধী' ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর বিরোধিতা করেছিলেন। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ ডিসি সারওয়ারের এই স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।
তার প্রত্যাহার আদেশ বাতিলের দাবিতে সোমবার দিনব্যাপী সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। সমর্থকদের দাবি, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নেওয়ার কারণেই একটি প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী মহল তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ
বিদায়ী জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের স্থলে পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহা ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার লক্ষ্যে গৃহীত প্রক্রিয়াগুলো চলমান থাকবে।
ডিসি সারওয়ার আলম বিদায়ের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিলেটবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি বার্তা দিয়েছেন। তার এই সাহসী ও স্বচ্ছ উদ্যোগ সিলেটসহ সারা দেশের আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে মাজারের মতো পবিত্র স্থানগুলোর আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরাতে এক গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।
