ব্রেকিং নিউজ
লোডিং হচ্ছে...

জাতীয় সংসদে সরকারের আর্থিক নীতির কঠোর সমালোচনা করলেন এমপি রেজা কিবরিয়া

ঢাকা: দেশের চলমান অর্থনৈতিক সংকট ও ব্যাংকিং খাতের অরাজক পরিস্থিতির ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জাতীয় সংসদে নিজ দলের সরকারের কঠোর সমালোচনা করলেন সংসদ সদস্য রেজা কিবরিয়া। বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংকিং খাতের নীতিনির্ধারণী ত্রুটিগুলো জনসমক্ষে তুলে ধরেন, যা সংসদের সাধারণ কার্যক্রমে বিরল এক দৃশ্যের অবতারণা করেছে।

জাতীয় সংসদে সরকারের আর্থিক নীতির কঠোর সমালোচনা করলেন এমপি রেজা কিবরিয়া
ফাইল ফটো 

ব্যাংকিং খাতের নাজুক পরিস্থিতি ও খেলাপি সংস্কৃতি

সংসদ সদস্য রেজা কিবরিয়া তার দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলেন, বিশ্বজুড়ে ব্যাংকিং সূচক ৬ অতিক্রম করলেই উদ্বেগের কারণ হয়, অথচ বাংলাদেশে এই সূচক ৬১-তে পৌঁছেছে, যা ব্যাংকিং খাতের ভয়াবহ পতনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, সাধারণ আমানতকারীদের কাছ থেকে ৫ শতাংশ সুদে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও, সৎ ব্যবসায়ীদের ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়ার জন্য নিয়ম পরিবর্তনের বিষয়টি। আগে ৯০ দিন কিস্তি বা সুদ বকেয়া থাকলে ঋণখেলাপি হিসেবে গণ্য করা হতো, কিন্তু বর্তমানে সেই সময়সীমা বাড়িয়ে এক বছর করা হয়েছে। এই নীতিকে তিনি ‘খেলাপি সংস্কৃতি’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এর ফলে ব্যাংকিং খাত আজ পঙ্গুত্বের দ্বারপ্রান্তে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের নামে বিলাসিতা

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গুণগত মান বা ‘কোয়ালিটি অফ গ্রোথ’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের পরিবর্তে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও শপিং মল নির্মাণে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, এ ধরনের বিনিয়োগ দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ায় না, বরং মুদ্রাস্ফীতি ও সুদের হার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ও বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি

বিগত ১৫ বছরের পরিসংখ্যান টেনে তিনি বলেন, রাজস্ব আদায়ের হার কখনো লক্ষ্যমাত্রার ৮০-৮৪ শতাংশ ছুঁতে পারেনি, বরং সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশে সীমাবদ্ধ থেকেছে। অথচ প্রতি বছর বাজেট প্রণয়নে অবাস্তব ও আকাশকুসুম লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। ঘাটতি মেটাতে সরকারের ব্যাংক ও বিদেশ থেকে ঋণের ওপর নির্ভরশীলতাকে তিনি চরম বিপজ্জনক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, জিডিপির ৪০ শতাংশ ঋণ এবং ২০ শতাংশ ডেট সার্ভিসিংয়ের বর্তমান অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণ দেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

প্রান্তিক মানুষের জীবনমান ও অর্থনৈতিক বৈষম্য

বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে তিনি সাধারণ মানুষের কষ্টের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এসিতে বসে আয়ের সুষম বণ্টনের তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। একজন দিনমজুরের আয়ের সাথে চালের দামের অনুপাতই প্রকৃত অর্থনীতির পরিমাপক, যা বর্তমানে ভেঙে পড়েছে। তিনি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থিক সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ধনী ব্যক্তিদের হাতে নগদ অর্থ দিলে তা ব্যাংকে জমা হয়, কিন্তু গরিব মানুষের হাতে অর্থ দিলে তা বাজারে খরচের মাধ্যমে অর্থনীতিকে গতিশীল করে।

সংসদে সরকারের নিজের দলের এমপির এমন বলিষ্ঠ ও সত্যনিষ্ঠ বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশের স্বার্থে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে সত্যকে তুলে ধরার এমন সাহসিকতা আজ প্রশংসিত হচ্ছে সচেতন মহলে।

শেয়ার করুন:

নামাজের সময় (ঢাকা)
লোড হচ্ছে...