বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পলাশীর ট্র্যাজেডি আজও এক জীবন্ত সতর্কবার্তা। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, তা কেবল সামরিক পরাজয় ছিল না; বরং ছিল অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা এবং বহিরাগত শক্তির সাথে গোপন আঁতাতের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। প্রায় পৌনে তিনশ বছর পেরিয়ে গেলেও পলাশী আজ আর কেবল মানচিত্রের কোনো নির্দিষ্ট স্থান নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও জাতীয় সতর্কবার্তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
![]() |
| আজ ঐতিহাসিক পলাশী দিবস |
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিদেশি প্রভুদের আনুকূল্যে যারা ক্ষমতায় আরোহণ করেন, তারা শেষ পর্যন্ত জাতীয় স্বার্থের চেয়ে প্রভুদের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই বেশি তৎপর থাকেন। যখন কোনো গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক শক্তি জনগণের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করে বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে, তখনই সমাজে ‘নব্য পলাশী’র প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। লর্ড ক্লাইভের সেই বিখ্যাত উক্তি—মুর্শিদাবাদের সাধারণ মানুষ যদি সেদিন কেবল একটি করে পাথর ছুঁড়ত, তবে ব্রিটিশদের অস্তিত্ব থাকত না—আজকের দিনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এই উক্তি প্রমাণ করে যে, বিদেশি আধিপত্যবাদের শিকড় তখনই মজবুত হয়, যখন দেশের সাধারণ মানুষ রাজনীতি ও রাষ্ট্রের ভাগ্য নির্ধারণে নিষ্ক্রিয় বা উদাসীন থাকে।
ঐতিহাসিক সত্য এই যে, ইতিহাসের পাতায় মীর জাফরদের পরিণতি অত্যন্ত করুণ। বিদেশি প্রভুরা যখন তাদের স্বার্থ উদ্ধার করে নেয়, তখন এই পুতুল শাসকদের মূল্য তাদের কাছে ডাস্টবিনের ময়লার চেয়ে বেশি হয় না। মীর জাফরের শেষ জীবন ছিল চরম অপমান, অবহেলা ও ধিক্কারের শিকার। আজকের যুগেও নব্য উপনিবেশবাদের কুশীলবরা যখন কোনো দেশের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন তারা প্রথমে অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকদের খুঁজে বের করে। এই বিশ্বাসঘাতকরাই ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে বিসর্জন দিয়ে বিদেশি প্রভুদের দাসানুদাসে পরিণত হয়।
বাংলাদেশসহ যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য আজকের এই ‘নব্য পলাশী’র রাজনীতি এক বড় সংকট। যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে বিদেশি শক্তির তোষামোদ করা হয়, তখন তা প্রকারান্তরে দেশের সাধারণ মানুষের আত্মমর্যাদাকেই ভূলুণ্ঠিত করে। পলাশীর শিক্ষা হলো, একটি জাতির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মূল শক্তি হলো তার জনগণের সচেতনতা ও ঐক্য। দেশের সাধারণ মানুষ যদি জাতীয় স্বার্থে অটল থাকে এবং দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সজাগ থাকে, তবে কোনো অপশক্তিই দেশের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস পাবে না।
পরিশেষে বলা যায়, পলাশী আমাদের কেবল অতীত ভুলে যাওয়ার শিক্ষা দেয় না, বরং বর্তমানের সতর্ক পাহারাদার হতে শেখায়। যারা মনে করেন বিদেশি শক্তি দিয়ে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব, তারা ইতিহাস থেকে কিছুই শেখেননি। ইতিহাসের বিচার বড়ই নির্মম; ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে অর্জিত সাফল্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং শেষ পর্যন্ত তা জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য চরম দুর্গতিই বয়ে আনে। তাই জাতীয় মুক্তি ও অগ্রগতির জন্য বিদেশি নির্ভরতা নয়, বরং দেশপ্রেম ও জনগণের ওপর আস্থাশীল রাজনীতিই আজকের সময়ের একমাত্র দাবি।
