এবারের মতো বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনেও জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমতারোহণের পথে 'ডিপস্টেট' বা রাষ্ট্রের অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক গোষ্ঠী একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ দলটির বিশাল জনসমাবেশ, কর্মীদের উন্মাদনা এবং নির্বাচনী আমেজ থাকা সত্ত্বেও পর্দার অন্তরালে থাকা শক্তির কারণে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। বড় বড় জনসভায় সাধারণ মানুষ ট্রেনের ছাদে চড়ে স্লোগান দেবে এবং আনন্দমুখর পরিবেশে ভোটও দেবে। কিন্তু দিনশেষে দেখা যেতে পারে, জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতার মসনদ অন্য কারো দখলে চলে গেছে। তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষণে ‘খাবে-দাবে আবুল, মোটা হবে বাবুল’—এই প্রবাদটিই বর্তমানে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।
![]() |
| জামায়াতের সামাজিক কাজ |
অস্তিত্ব রক্ষায় ইসলামপন্থী শক্তির বিরোধিতা
ডিপস্টেটের একটি অংশ নিজেদের স্বার্থ এবং অস্তিত্বের প্রয়োজনেই কোনো ইসলামপন্থী শক্তিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় দেখতে চায় না। কারণ তারা মনে করে, আদর্শিক কোনো শক্তি ক্ষমতায় এলে তাদের দীর্ঘদিনের কায়েমি স্বার্থ ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ভেঙে পড়তে পারে। এই অদৃশ্য শক্তির বিন্যাস এতটাই জটিল যে, তারা নির্বাচনের দৃশ্যমান প্রক্রিয়ার বাইরে থেকেই ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। তাই কেবল জনসমর্থন বা সুশৃঙ্খল ক্যাডার দিয়ে এই দেয়াল টপকানো সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বুঝতে হলে আমাদের ইতিহাসের গভীর শিকড়ে ফিরে যেতে হবে।
মদিনার ডিপস্টেট ও রাসুল (সা.)-এর কৌশল
মদিনার তৎকালীন ডিপস্টেট ছিল বর্তমান সময়ের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী ও ভয়ংকর। কারণ তখন স্থানীয় আরবের বাইরে থেকে আসা ইহুদিরা মদিনার অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করত। তারা স্থানীয় আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে চিরস্থায়ী দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখত এবং সুদী কারবারের মাধ্যমে মানুষকে ঋণের জালে আটকে ফেলত। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করেই প্রথম এই দুই বিবাদমান গোত্রকে ঐক্যবদ্ধ করেন। এর ফলে ইহুদিদের শত বছরের একচেটিয়া প্রভাব খর্ব হয় এবং তারা কৌশলগতভাবে ব্যাকফুটে চলে যায়।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রাজত্ব রক্ষার লড়াই
রাসুল (সা.)-এর আগমনে ইহুদিরা তাদের সুদী কারবার ও রাজনৈতিক আধিপত্য হারানোর আশঙ্কায় কোমর বেঁধে নামে। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল, ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের শোষণের ভিত্তি ধসে পড়বে। তারা এমনকি নবীজিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রও করেছিল। কিন্তু রাসুল (সা.) অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে স্থানীয়দের ঐক্যবদ্ধ করে এবং বিভিন্ন গোত্রের সাথে কৌশলগত চুক্তি করে মদিনার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। কোনো কোনো গোত্রকে উৎখাত করার মতো কঠোর সিদ্ধান্তও তাকে নিতে হয়েছিল সেই শক্তিশালী ডিপস্টেটকে নিয়ন্ত্রণে আনতে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ঘাম ঝরানোর প্রয়োজনীয়তা
কেবল কয়েকটা বড় সমাবেশ করেই ক্ষমতায় বসার চিন্তা করা এক ধরনের রাজনৈতিক অপরিণত মানসিকতা। কারণ ইতিহাসের প্রধান সিপাহসালারকেও একটি রাষ্ট্রের গভীর ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় কঠোর পরিশ্রম ও ঘাম ঝরাতে হয়েছে। ডিপস্টেটের অদৃশ্য দেয়াল ভাঙতে হলে কেবল মাঠের স্লোগান যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন গভীর কৌশলগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি। যারা এই অদৃশ্য শক্তির প্রভাবকে অস্বীকার করে কেবল লাঠির জোরে ক্ষমতায় আসতে চায়, তারা বারবার হোঁচট খাবে। তাই রাষ্ট্রিক বাস্তবতা বুঝতে হলে মদিনার সেই ঐতিহাসিক শিক্ষা আজও সমানভাবে কার্যকর।
