দেশের ঐতিহ্যবাহী কওমী মাদরাসাগুলোর ভাবমূর্তি রক্ষা, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে শীর্ষ ওলামায়ে কেরাম ও দায়িত্বশীলদের প্রতি ৬ দফা প্রস্তাবনা পেশ করেছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ। সাম্প্রতিক সময়ে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক ও একপেশে অপপ্রচারের প্রেক্ষাপটে আত্মসংশোধন ও কাঠামোগত সংস্কারের তাগিদ দিয়ে তিনি এই প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
![]() |
| ফাইল ফটো |
দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মনন গঠনে কওমী মাদরাসার ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহ জানান, যুগ যুগ ধরে এই প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় অনুদান ছাড়াই লাখ লাখ এতিম ও দুস্থ শিশুর অন্ন, বস্ত্র ও শিক্ষার ভার বহন করে সামাজিক নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করছে। তবে এই গৌরবোজ্জ্বল অবদানের পাশাপাশি মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির দ্বারা শিশুদের ওপর শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধের বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও লজ্জাজনক। ইসলামি শরীয়াহ অনুযায়ী এটি কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি অভিযোগ করেন, এক শ্রেণির গণমাধ্যম ও স্বার্থান্বেষী মহল মাদরাসার ইতিবাচক দিকগুলো এড়িয়ে গিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নেতিবাচক খবরগুলোকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করছে। অনেক ক্ষেত্রে নিরীহ আলেমদের ফাঁসানোর ঘটনাও ঘটছে। তবে মিডিয়ার অপপ্রচারের অজুহাতে বাস্তব সমস্যাগুলো অস্বীকার করে অপরাধীদের ধামাচাপা দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও তিনি সতর্ক করেন।
বিদ্যমান সংকট নিরসনে শায়খ আহমাদুল্লাহর দেওয়া ৬ দফা প্রস্তাবনার মধ্যে রয়েছে:
১. কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি গঠন: আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশের অধীনে শীর্ষ আলেম ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা। এই কমিটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবে এবং দোষীদের একটি কেন্দ্রীয় ‘কালো তালিকায়’ অন্তর্ভুক্ত করবে।
২. অভিযোগ গ্রহণ সেল: ভিক্টিমদের অভিযোগ গ্রহণের জন্য সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে একটি হটলাইন বা অভিযোগ গ্রহণ সেল গঠন করা, যা ভিক্টিমদের মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়তা করবে।
৩. প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত সংস্কার: মাদরাসার সংবেদনশীল এলাকাগুলোকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা, কম বয়সী শিশুদের আবাসিক না রেখে অনাবাসিক হিসেবে পাঠদানে উৎসাহিত করা, গণরুমে বিছানার মাঝে ন্যূনতম দূরত্ব বজায় রাখা এবং শিক্ষার্থীদের দিয়ে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত সেবা গ্রহণের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা।
৪. শিক্ষক ও স্টাফদের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন: শিক্ষকদের জন্য সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি প্রণয়ন, শিশু মনস্তত্ত্বের ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান, বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে বিবাহিত ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং শিক্ষকদের জন্য পারিবারিক আবাসন ও যৌক্তিক ছুটির ব্যবস্থা করা।
৫. নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতি: বালিকা মাদরাসাগুলোর প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে নারী কর্মীদের দ্বারা পরিচালনা করা এবং সেখানে পুরুষ স্টাফ নিয়োগ বর্জন করা। আবাসিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করা।
৬. অনিয়ন্ত্রিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তদারকি: যত্রতত্র গড়ে ওঠা মানহীন অপরিকল্পিত প্রাইভেট মাদরাসাগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মতন্ত্র ও নজরদারির আওতায় নিয়ে আসা।
সর্বশেষ তিনি আশা প্রকাশ করেন, কওমী মাদরাসার অভিভাবক সংস্থাগুলো এই প্রস্তাবনা আমলে নিয়ে নিবন্ধন ও নজরদারির ক্ষেত্রে কঠোরতা আরোপ করবে। আত্মপক্ষ সমর্থনের ঊর্ধ্বে উঠে কঠোর আত্মসংশোধনের মাধ্যমেই কওমী মাদরাসার ঐতিহ্য, গৌরব এবং সাধারণ মুসলমানদের আস্থা অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

